Getting your Trinity Audio player ready...

বাঙালির জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলন প্রভাব ফেলেছিলো সমগ্র পরাধীন ভারতবর্ষে। বিপ্লবী ভাবধারার রোদ্দুর বাংলা-সাহিত্যের উঠোনেও আলো ছড়ায়। বাংলা নাটক, উপন্যাসেও, অন্যান্য সাহিত্যকর্ম তথা কবিতাতেও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে আজও অমর করে রেখেছে, লিখেছেন তাপসী বৈরাগী।

১. ‘আনন্দমঠ’: (১৮৮১)

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’। সত্যানন্দের সংগঠিত সন্তানদল সাংগঠনিক সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসটি দেশভক্তির সঙ্গে সশস্ত্র বিপ্লবের প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়াস নিয়েছিলো। ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রে উজ্জীবিত সন্তানদল দেশকে দেবীমূর্তিতে কল্পনা করেই জাতীয়তাবোধে উদ্দীপিত এবং আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। বিপ্লবী গুপ্ত-সংগঠন রচনার প্রেরণা, দেশকে দেবীরূপে দেখানো, স্বদেশপ্রেমকে সর্বোচ্চ ধর্মরূপে গণ্য করা প্রভৃতি দিক থেকে বইটি ছিল প্রেরণা-সঞ্চারী।
মাস্টারদা সূর্য সেন তাঁর অনুগামীদের সমোচিত উদ্দীপনা সঞ্চারে ‘আনন্দমঠ’ এর ওপর নির্ভর করেছিলেন। চট্টগ্রামে কর্ণফুলীতীরে অনুজ সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি আনন্দমঠের আত্মত্যাগ, ভক্তি-সাধনা ও স্বাদেশিক ব্রতের উল্লেখ করেন।

২. ‘গোরা’: (১৯১০)

রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক উপন্যাস ‘গোরা’ আলোচনায় কেউ কেউ ‘ঘরে বাইরে (১৯১৬) ও চার অধ্যায় (১৯৩৪) অধিকতর প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ গোরাকে ধর্মীয় ও সংস্কারবন্ধন উত্তীর্ণ করে কল্যাণকারী সেবক করে তুলেছেন। তাঁর সংস্কারবদ্ধতা, ইংরেজ বিদ্বেষ হিন্দু সভ্যতা ও ধর্মের অনুসন্ধান স্বদেশীযুগের উন্মেষ-পর্বের চেতনার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু গোরা নিখিলেশের মতোই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, তাই ব্যক্তির এই প্রয়াস ও বিপন্ন হতে বাধ্য। স্বদেশী আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভালো ও মন্দ দিকের মতো হিন্দু মুসলমান সম্পর্কের বিরোধ বসন এবং কৃষকদের শামিল করতে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের আন্দোলনের ব্যর্থতার কথা আছে।

৩. ‘ঘরে বাইরে’:

এই উপন্যাসে স্বদেশী আন্দোলন ছবি ফুটে উঠেছে। ঘরে বাইরে উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু হলো বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমিতে প্রেম, আদর্শ এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের বিশ্লেষণ। নিখিলেশ ত্যাগ, স্বাধীনতা ও কল্যাণবোধের প্রতীক। সন্দীপ ভোগ ও অধীশ্বর অর্জনে শক্তি প্রয়োগের আদর্শে বিশ্বাসী। বিমলা হলো স্বাদেশিক প্রয়াসের দুই ধারার দোলামাত্র। তাকে কেন্দ্র করেই দুই ধরনের স্বাদেশিক প্রয়াস সর্বোচ্চস্থানে উঠতে চায়। নিখিলেশ এর স্বাদেশিকতাবোধ জয়ী হয় যদিও প্রভূত সামাজিক ও ব্যক্তিক ক্ষতির বিনিময়ে। নিখিলেশ যথার্থ স্বদেশব্রতী হলেও স্বদেশীযুগে তার সমর্থন ছিল সংখ্যায়। হঠাৎ পাগড়িবাঁধা গেরুয়া পরা যুবক ও বালকের দল নিয়ে সন্দীপ যখন জমিদারিতে ঢুকে পড়ল, মরা নদীতে প্রথম বর্ষার গেরুয়া বন্যার ধারার মতো তখন তাকে প্রতিহত করা সহজ ছিল না। নিখিলেশের এলাকা থেকে বিলিতি সুতো, ব্যাপার প্রভৃতি পণ্যকে উঠিয়ে দেওয়ার দাবি উঠল। নিখিলেশ নিজে বিলিতি জিনিস ব্যবহার করত না, দ্ব্যর্থহীন স্বদেশি শিল্পের উৎপাদন-আমদানিতে প্রত্যক্ষ অংশ নিয়েছিল। অন্যদিকে বিদেশী কাপড় আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগে এই উপন্যাস বিপ্লবীদের কাছে অনেকখানি প্রেরণাসূচক ছিল তাতে কোনো দ্বিমত নেই।

৪. ‘চার অধ্যায়’: (১৯৩৪)

এক হিসেবে এটি ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের পরিণতি। উপন্যাসের অধিনায়ক চরিত্র ইন্দ্রনাথ খ্যাতিমান বিজ্ঞানী। বিদেশী অপশাসনের বিরুদ্ধে তিনি দল সংগঠন করেছেন। সাহেবরা যাদের বলত টেররিস্ট, রবীন্দ্রনাথ বলতেন বিভীষিকাপন্থী। ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে বিপ্লব প্রচেষ্টার ভূমিকায় ‘আখ্যায়িকা স্থাপন করেছেন। বিপ্লবী দলের অধিনায়কের আদর্শ নির্দয় হবে না, কিন্তু কর্তব্যের বেলা নির্মম হতে হবে।” এই নির্মমতা কতদূর যেতে পারে তারই পরীক্ষা হয়েছে তরুণ-তরুণীদের জীবনে।
রবীন্দ্রনাথ চরমপন্থী (সন্ত্রাসবাদী) আন্দোলনকে দূর থেকে দেখেছেন এবং একটা আকর্ষণ বোধ করেছেন। কিন্তু চরমপন্থী আন্দোলনে ব্যক্তির ব্যর্থতাবোধকেও দেখেছেন। সমালোচনা সত্ত্বেও তৎকালীন সময়ে এই আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত অনেকখানি নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল; বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে ও বিপ্লবীদের অনেকখানি প্রেরণা প্রদানকারী ছিল এই উপন্যাস।

৫. ‘পথের দাবী’: (১৯২৬)

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত এই সাহিত্য সৃষ্টিটি ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে বিপ্লবীদের সংগ্রাম, দেশাত্মবোধ ও মানবতার মর্মস্পর্শী দলিল। উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু হলো- বিপ্লবী নায়ক মেধাবী সব্যসাচী ও সংগঠনের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন। প্রকাশের পরই বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়া এই উপন্যাসে শরৎচন্দ্র বর্মা, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি অঞ্চলে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড বিষয়ক তথ্য ও শ্রুতিকে ব্যবহার করে ব্রিটিশরাজ বিরোধী গল্প ও রাজনৈতিকতার রোমাঞ্চকর কাহিনী রচনা করেছেন। রাষ্ট্রীয় পরাধীনতায় ব্যক্তি স্বাধীনতার ও অর্থনৈতিক বিঘ্নকে শরৎচন্দ্র দেখেছেন মনুষ্যত্বের লাঞ্ছনার রূপ হিসেবে। শ্রমজীবী আন্দোলন পরিচালনা ও শ্রমিক সেবা ‘পথের দাবী’ নামে প্রতিষ্ঠানটির শুরু।
তৎকালীন বাঙালি যুবসমাজের মনে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া এবং ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলাই ছিল উপন্যাসের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। ‘পথের দাবী’ শুধু একটি উপন্যাস নয়, এটি ছিল তৎকালীন মুক্তিকামী বাঙালি ও ভারতীয়দের মনে জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগিয়ে তোলার এক প্রামাণ্য দলিল। ব্রিটিশ সরকার এই উপন্যাসের বিপ্লবী আদর্শ ও বার্তার কারণে এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, সব্যসাচী মল্লিক চরিত্রের বাস্তব অনুপ্রেরণা কে?

৬. ‘জাগরী’: (১৯৪৫)

১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ ও সমসাময়িক রাজনৈতিক পটভূমিতে রচিত সতীনাথ ভাদুড়ীর প্রথম ও বিখ্যাত উপন্যাস হলো ‘জাগরী’। দেশভাগের পূর্বে বৃহত্তর বিহার অঞ্চলের একটি রাজনৈতিক পরিবারের মতাদর্শ এবং ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা নিয়ে উপন্যাসের চরিত্রগুলোর উপস্থিতি। উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, রাতজাগা চার চরিত্রের জেলের ঘড়ির সাথে তাল মিলিয়ে স্বগতোক্তি ও স্মৃতিরোমন্থনের কাহিনী। এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সাধারণ বাঙালি জনগণের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরে। সতীনাথ ভাদুড়ী নিজে (১৯৪২-৪৪) সালে রাজনৈতিক বন্দী হিসাবে ভাগলপুর জেলে আটক ছিলেন। সমসাময়িক ভারতীয় রাজনীতি এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। তিনি এই উপন্যাসের কাহিনীতে বহু আত্মজৈবনিক উপাদান যোগ করেছেন।

৭. ‘মন্বন্তর’: (১৯৪৩)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৩ সালের বাংলার আকালের প্রেক্ষাপটে রচিত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত এই উপন্যাসে কেবল মানুষের হাহাকার নয়, বরং তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদী শাসন, পুঁজিবাদীদের মুনাফালোভী চরিত্র এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বন্দ্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। উপন্যাসের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী কীভাবে কীভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কালোবাজারি ও মজুতদারির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে খাচ্ছিল, তার চিত্র তুলে ধরেছেন ঔপন্যাসিক। এখানে যুদ্ধকে মুনাফাবাজি, পুঁজিবাদীদের শ্রেণীগত স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তারাশঙ্করের লেখায় গান্ধীজির গ্রাম- স্বরাজ ও অহিংসার আদর্শ, আন্দোলনের প্রভাব ও গঠনমূলক রাজনীতির আদর্শ ফুটে ওঠে। উপন্যাসের পটভূমি গ্রামীণ সমাজ থেকে শিল্পাঞ্চল। শ্রমিক অসন্তোষ ও কৃষক বিদ্রোহের রাজনীতি গল্পের গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মাধ্যমে তৎকালীন বুর্জোয়া শ্রেনীর স্বার্থপরতা, খাদ্যের হাহাকার, বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা এবং মার্ক্সবাদ ও গান্ধীবাদ উভয় মতাদর্শের দ্বন্দ্বকে সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছেন।

সরাসরি রাজনীতি নিয়ে লেখা বাংলা উপন্যাসের সংখ্যা বেশি নয়। বাংলা উপন্যাসে সূচনা থেকে আন্দোলন-ভিত্তিক রাজনীতি,  চরমপন্থা (সন্ত্রাসবাদ) যতটা ঔপন্যাসিককে আকৃষ্ট করেছে ততটা অন্য কোনো আন্দোলন করেনি। যদিও অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের কথা বেশ কিছু উপন্যাসে আছে। সন্ত্রাসবাদের নাটকীয়তা, রোমাঞ্চকরতা ও অকাল বিয়োগের মর্মান্তিকতার জন্যে সহানুভূতি বিষয় নির্বাচনে সাহায্য করেছে।

 

লেখক: সহশিক্ষিকা
কামারপোতা রামকৃষ্ণ বিদ্যামন্দির (উচ্চ মাধ্যমিক),
নালুয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনা