Getting your Trinity Audio player ready...

১৯০০ সালে শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম পার্ষদ স্বামী অখণ্ডানন্দ মহারাজ যে কাজটা শুরু করেছিলেন, তার ফসল ফি বছর মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় শীর্ষস্থান ধরে রাখার শপথ ছিল না। তাঁর ‘আদর্শ’ ধরা আছে ছোট্ট এই ‘হারানো বাক্সে’। যার মধ্যে রয়েছে দু’শো টাকার হারানো নোট আর আধখানা পেন্সিল ফিরিয়ে দেওয়ার শিক্ষা। লিখেছেন কুন্তল মন্ডল

সাদা চোখে দেখলে মনে হবে, এইটুকু জায়গার মধ্য দিয়ে এতবড় লাঠিটা প্রবেশ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। অথচ সুইচে আঙুল রাখামাত্র ওই স্বল্প পরিসরে মোটা লাঠিটা দিব্যি গলে গেল! যন্ত্রটির উপরে লেখা স্বামীজির কথা, “মানুষের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়।”
আপাতভাবে তাকালে মনে হবে অতলস্পর্শী এক কুয়ো। আসলে আয়নাগুলো সাজানো রয়েছে কৌণিকদূরত্বে। সায়েন্স মিউজিয়ামে এমন হাজারো আপাত-মজার অথচ গভীর দর্শন-বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ছড়িয়ে রয়েছে। মিউজিয়ামের নাম ‘ট্রুথ বিয়ন্ড দ্য মায়া’। সবুজের মধ্যে কলকাতার সায়েন্স সিটির একটা খুঁদে সংস্করণ। একই সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে ‘সায়েন্স কাল্টিভেশন সেন্টার’। ফি-সপ্তাহে এখানে বসে বিজ্ঞান চিন্তন শিবির। মাস্টার মশাই থেকে ছাত্ররা সেখানে কোনও একটা বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। ছাত্ররা সেসব শুনে বিজ্ঞানভিত্তিক জিনিসপত্র তৈরি করে রাখছেন সযত্নে। কে, কীভাবে সেসব বাস্তবায়ন করবে এটা তাঁদের ব্যাপার। তবে বিজ্ঞান অনুশীলন কেন্দ্রে প্রত্যেকের আসা চাই।

শুধু কি বিজ্ঞানচর্চা! স্কুলের মধ্যেই রয়েছে ইংলিশ ক্লাব। সেখানে ‘শেক্সপিয়ার টেবিল’, ‘মিল্টন টেবিল’, চলে লাগামছাড়া ইংরেজি ভাষা এবং সাহিত্যের কসরত। একইভাবে তৈরি করা হয়েছে ‘ম্যাথস-ক্লাব’। যে ছাত্র যে বিষয়ে দুর্বল, অন্য আগ্রহী ছাত্র এবং শিক্ষকদের কাছে সেই বিষয়ের গল্পের আসর, আলোচনা ও তর্ক বসে ওইসব টেবিলে।

এসব আইডিয়া কলকাতার কোনও নামি-দামি অভিজাত কর্পোরেট স্কুলের ঘটনা নয়। মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহর থেকে আরও দশ কিলোমিটার ভেতরে সারগাছি রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল। সেখানেই রয়েছে এসবের আয়োজন। এমন শিক্ষা-বান্ধব পরিবেশের খোঁজে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি বা দক্ষিণবঙ্গের মেদিনীপুর জেলা থেকে শুধু নয়, ত্রিপুরা এমনকি আসাম থেকে মা-বাবারা তাঁদের সন্তানদের পাঠাচ্ছেন এই স্কুলে। তবে, চাইলেই হবে না। সমস্ত রামকৃষ্ণ মিশনে পড়ার সুযোগ পেতে গেলে বসতে হবে প্রবেশিকা পরীক্ষায়।
কিন্তু, সরকার যখন বলছে, সমস্ত ছাত্রকে পড়ার সুযোগ দিতে হবে; তাহলে অ্যাডমিশন টেস্ট কেন? স্কুলের প্রধান শিক্ষক স্বামী তপোনিষ্ঠানন্দ জী জানালেন, “রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলগুলি হল জওহর নবোদয় বিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় বা সৈনিক স্কুলগুলির মতো স্পেশ্যাল ক্যাটেগরিভুক্ত। তাই আমরা প্রবেশিকা পরীক্ষা নিতে পারি। আমাদের উদ্দেশ্য, প্রচুর শিশু ভর্তি করা নয়। একজন শিশুকে যথাযথভাবে মানুষ গড়ে তোলা, যেটা স্বামীজি বলেছিলেন— “ম্যানিফেস্টেশন অফ দ্য পারফেকশন…।”

বিশাল স্কুল চত্বরে তাকালে চোখে পড়বে কয়েকটা ক্লাস তফাতে আলাদা আলাদা দেওয়াল পত্রিকা।
এরকমটা কেন?
স্কুলের সহ-প্রধান শিক্ষক সুদীপ্ত কুমার চক্রবর্তী জানালেন, “আমাদের স্কুলে প্রত্যেক ক্লাসের জন্য আলাদা ‘ওয়াল-ম্যাগ’। সেখানেও চলে সুস্থ প্রতিযোগিতা- কোন ক্লাসের ছাত্ররা কোন ক্লাসকে টেক্কা দেবে! এতবড় স্কুল, পুরোটাই পরিষ্কার করে ছাত্ররা। কোনও আলাদা সাফাইকর্মী নেই।”

স্কুলের পিছনে একতলায় দেড় হাজার আসনের বিশাল অডিটোরিয়াম। দোতলাতে জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ কেন্দ্র। সেখানে বিভিন্ন প্রাণী ‘স্টাফ’ করা রয়েছে। যেদিকে চোখ পড়বে, সবুজের মধ্যে শিক্ষার এক অনুপম বাহার! তবে সুদীপ্ত বাবু জানালেন, “এসব পুরোটাই বাহ্যিক। রামকৃষ্ণ মিশনের আসল সাফল্য প্রতিবছর বিশ-পঞ্চাশজন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করা নয়। ‘শিশুমিত্র’ বা ‘যামিনী রায়’ পুরস্কার পাওয়াও নয়।

কথা বলতে বলতে নজরে এলো খোলা রয়েছে, ‘লস্ট বক্স’। সেখানে কুড়িয়ে পাওয়া দু’শো টাকার নোটও রয়েছে। আবার আধখানা পেন্সিলও রয়েছে। প্রধান শিক্ষক তপোনিষ্ঠানন্দ মহারাজ দেখালেন, “১৯০০ সালে শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম পার্ষদ স্বামী অখণ্ডানন্দ মহারাজ যে কাজটা শুরু করেছিলেন, তার ফসল ফি বছর মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় শীর্ষস্থান ধরে রাখার শপথ ছিল না। তাঁর ‘আদর্শ’ ধরা আছে ছোট্ট এই ‘হারানো বাক্সে’। যার মধ্যে রয়েছে দু’শো টাকার হারানো নোট আর আধখানা পেন্সিল ফিরিয়ে দেওয়ার শিক্ষা।”

 

আপনার স্কুলে কি অলক্ষ্যে এমন কিছু প্রয়াস ও উদ্যোগ চলছে যা আমরা জানি না। আছি আপনাদের পাশে। জানান, ই-মেল করে : ‘সেরা ক্যাম্পাস’: letusinbox@gmail.com