|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
‘পথের দাবী’ (১৯২৬):
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত এই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু হলো- বিপ্লবী নায়ক মেধাবী সব্যসাচী ও সংগঠনের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন। প্রকাশের পরই বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়া এই উপন্যাসে শরৎচন্দ্র বর্মা, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি অঞ্চলে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড বিষয়ক তথ্য ও শ্রুতিকে ব্যবহার করে দেশের বিপ্লবীদের সাহস ও আত্মত্যাগের অনুভবকে সঞ্চার করা হয়েছে। ভারতীয় বিপ্লবের মূর্ত বিগ্রহ সব্যসাচী মল্লিক একজন দূরদর্শী, আত্মত্যাগী ও অকুতোভয়, প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন চরিত্র এঁকেছেন তিনি। একদল মনে করেন তিনি বিপ্লবী সুভাষচন্দ্র বসু। কিন্তু তথ্য প্রমাণের এ ধারণার বিপরীতে রাসবিহারী বসু-র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় এই উপন্যাসে। তাঁর লক্ষ্য সাম্রাজ্যবাদী অধীনতা থেকে মুক্তি। তার সংশয়হীন বিশ্বাসের পথ সশস্ত্র সন্ত্রাসের। রাষ্ট্রীয় পরাধীনতায় ব্যক্তি স্বাধীনতার ও অর্থনৈতিক বিঘ্নকে তিনি দেখেছেন মনুষ্যত্বের লাঞ্ছনার রূপ হিসেবে। শ্রমজীবী আন্দোলন পরিচালনা ও শ্রমিক সেবা ‘পথের দাবী’ নামে প্রতিষ্ঠানটির শুরু। ভারতী উপন্যাসের প্রধান নারীচরিত্রে তিনি সব্যসাচীর আদর্শে অনুপ্রাণিত, কিন্তু অহিংস ও মানবতাবাদী এক প্রগতিশীল নারী। অপূর্ব বাঙালি কর্মচারী, যিনি প্রথমে ভীরু ও সংস্কারাচ্ছন্ন হলেও পরবর্তীতে সব্যসাচীর নির্ভীক আদর্শ ও স্বদেশপ্রেমের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।
দিনটা ছিল ক্রিসমাসের, সাল ১৯১২। তৎকালীন বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের সিদ্ধান্তে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে স্থানান্তরিত হয়েছে দিল্লিতে। তারই উদ্বোধনে সারা শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জৌলুসময় ‘state entry’। বিরাট শোভাযাত্রার মধ্যে দিয়ে হার্ডিঞ্জ জমকালো সাজের পেল্লায় হাতির উপর বসে চলেছেন; হঠাৎ তার উপর এসে পড়ল দুটো বোমা। হুলুস্থুল পড়ে গেল, কার এত সাহস? কার নির্দেশেই বড়লাটকে বোমা ছোঁড়ে? কেউ জানতেন না, মহিলার ছদ্মবেশে দুইজন বিপ্লবী গুপ্ত সমিতির নায়ক রাসবিহারীর নির্দেশেই তাঁরা চাঁদনি চকে একটা বাড়ির ছাদে পজিশন নিয়েছিলেন। সযত্নে তাঁদের ছদ্মবেশে সাজিয়ে দিয়েছিলেন খোদ রাসবিহারী বসু। ইংরেজ সরকারের কাছে তাঁর মাথার দাম তখন অনেক। ফেরারি জীবনের সূত্রপাত অবশ্য হয়েছিল এ ঘটনার অনেক আগেই। এককালে ফরেস্ট অফিসের নিরীহ কেরানির ছদ্মবেশে চালাতেন বিপ্লবের কাজ। আর সেখানে বেশিদিন আত্মগোপন করে থাকা হলো না, সেখান থেকে পালাতে হলো কাশীতে। সেখানে গুপ্ত সমিতির ক্ষিপ্ত সদস্যদের বোমা বাঁধার তালিম দিতে গিয়ে কোনোভাবে ভাড়া বাড়ির ভেতরেই হলো বিস্ফোরণ। এলাকা কেঁপে উঠল শব্দে। ব্রিটিশ সরকার সব জায়গায় তাঁর ছবি দিয়ে রাসবিহারীকে যে ধরিয়ে দেবে তার জন্য এক মোটা টাকা পুরস্কার ঘোষণা করলেন। রাসবিহারীর মাথায় এল ফন্দি, তাঁর গ্রেপ্তার হতে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ, তাঁদের চোখের সামনে দিয়েই খাটিয়া করে চাদর চাপা মৃতদেহ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন লাশের ছদ্মবেশে রাসবিহারী বসু। এভাবেই পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে সেখান থেকে পালালেন তিনি। এমন ঘটনার সন্ধান রাসবিহারীর জীবনে যে কত পাওয়া যাবে তার ইয়ত্তা নেই। তাঁর ছদ্মবেশে জাপান পালানোর গল্প আজকের দিনেও শিহরণ জাগায়।
ভারত থেকে কাজ করা আর সম্ভব নয়, স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বার্থে জাপান যাওয়া প্রয়োজন। পাসপোর্ট কোথায়? এমন সমস্যার দিনে কানে এলো কয়েকদিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানে যাত্রা করবেন। এসে পড়ল সুযোগ। মাথায় সাদা রেশমের পাগড়ি এবং বুকে অভিজাত কোট চাপিয়ে পাসপোর্ট অফিসারের সঙ্গে চোস্ত ইংরেজিতে জানালেন তিনি রাজা পি. এন. টেগোর; রবীন্দ্রনাথের আত্মীয় এবং তাঁর সহকারী হিসেবে তিনি তাঁর জাপান যাত্রার সঙ্গী হবেন। রবীন্দ্রনাথের জাপান পৌঁছোনোর আগেই তাঁর অগ্রিম বন্দোবস্ত করবার জন্য জাপান যেতে হবে তাই অবিলম্বে তাঁর পাসপোর্ট চাই। ঠাকুরবাড়ির একজন পাসপোর্ট চাইছেন, পাসপোর্ট অফিসার আর দ্বিধা না করেই চটজলদি পাসপোর্টের ব্যবস্থা করলেন। এভাবেই ছদ্মবেশকে কাজে লাগিয়ে ভয়ঙ্কর সমস্ত অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়েছেন রাসবিহারী বসু। তাঁর এই ছদ্মবেশের কৌশল সব্যসাচী মল্লিকের মধ্যেও প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যায়। রাসবিহারীর মতোই তিনি বহু ভাষায় কথা বলতে পারেন।
ব্রিটিশ সরকারের চোখে সব্যসাচী ও তার সঙ্গীরা ছিলেন দেশদ্রোহী বা সন্ত্রাসী। কিন্তু উপন্যাসের মূল দর্শনে তারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক যারা পরাধীনতার গ্লানি মোচনে জীবন বাজি রেখেছেন। তৎকালীন বাঙালি যুবসমাজের মনে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া এবং ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলাই ছিল উপন্যাসের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় সব্যসাচী মল্লিক চরিত্রের বাস্তব অনুপ্রেরণা কে?
