Getting your Trinity Audio player ready...

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গুপ্ত রাজনৈতিক হত্যা (Political Assassinations) মূলত অগ্নিযুগের বাংলার বিপ্লবী বা সশস্ত্র সংগ্রামীদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন রোমাঞ্চকর ও দুঃসাহসিক ষড়যন্ত্র মামলাকে নির্দেশ করে।  স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রধান ও উল্লেখযোগ্য ৭ টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে লিখেছেন, প্রসেনজিৎ দে।

১. লোম্যান ও হাডসন হত্যা: (২৯ অগাস্ট, ১৯৩০)

অবিভক্ত বাংলার রাজবন্দীদের ওপর ব্রিটিশ পুলিশের অমানবিক ও বর্বর নির্যাতনের প্রতিবাদে ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’-এর বিপ্লবীরা রুখে দাঁড়ান। এই দমনপীড়নের নেপথ্যে ছিলেন বেঙ্গল পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল এফ. জে. লোম্যান এবং ঢাকার পুলিশ সুপার ই. সি. হাডসন। ১৯৩০ সালের ২৯শে আগস্ট ঢাকার মিটফোর্ড মেডিকেল হাসপাতাল পরিদর্শনে এলে, সুযোগ বুঝে ডাক্তারি ছাত্র ও বিপ্লবী বিনয়কৃষ্ণ বসু অত্যন্ত কাছ থেকে আই.জি লোম্যানকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। লোম্যান ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান। তাঁর সাথে থাকা এস.পি হাডসনও এই হামলায় মারাত্মকভাবে জখম হন এবং পরবর্তীতে মারা যান। এই দুঃসাহসিক কাণ্ড ঘটিয়ে বিনয়কৃষ্ণ বসু সাফল্যের সাথে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

২. রবার্ট উইলিয়ামসন ও সিম্পসন হত্যা: (২৪ জানুয়ারি, ১৯৩১ এবং ৮ ডিসেম্বর, ১৯৩০)

মেদিনীপুর ও বাংলার বিভিন্ন জেলে রাজবন্দীদের ওপর ব্রিটিশ প্রশাসনের অকথ্য নির্যাতনের মূল হোতা ছিলেন ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ প্রিজনস কর্নেল এন. এস. সিম্পসন। কোনও কোনও ইতিহাস বইয়ে যিনি রবার্ট উইলিয়ামসন হিসেবে উল্লিখিত রয়েছেন। তাঁকে শাস্তি দিতে ১৯৩০ সালের ৮ই ডিসেম্বর ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’-এর তিন বীর সন্তান— বিনয়কৃষ্ণ বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত ইউরোপীয় পোশাকে কলকাতার সুরক্ষিত রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করেন। তাঁরা সরাসরি আই.জি’র ঘরে ঢুকে তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন। এই ঘটনাটি ইতিহাসে ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে খ্যাত। অভিযানের পর বাদল গুপ্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন। এবং বিনয় ও দীনেশ নিজেদের গুলি করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। বিনয় হাসপাতালে মারা যান এবং দীনেশ গুপ্তকে ১৯৩১ সালের জুলাই মাসে ফাঁসি দেওয়া হয়।

৩. আর্নেস্ট পেডি হত্যা (৭ এপ্রিল, ১৯৩১)

মেদিনীপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আর্নেস্ট পেডি বঙ্গীয় বিপ্লবীদের দমনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এবং নিষ্ঠুর ছিলেন। তাঁর অমানুষিক অত্যাচার বন্ধ করার উদ্দেশ্যে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের বিপ্লবীরা পেডিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ১৯৩১ সালের ৭ই এপ্রিল মেদিনীপুর জেলা স্কুলে একটি শিক্ষা প্রদর্শনী পরিদর্শনের সময় কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের দুই দুঃসাহসী সদস্য— বিমল দাশগুপ্ত ও জ্যোতিজীবন ঘোষ পেডির অত্যন্ত কাছাকাছি চলে যান। তাঁরা আচমকা রিভলভার বের করে পেডিকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে উপর্যুপরি গুলি চালান। গুলিবিদ্ধ হয়ে জেলাশাসক পেডির ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় এবং বিপ্লবীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে সেখান থেকে পালিয়ে যান।

৪. চার্লস গার্লিক হত্যা: (১৯৩১-১৯৩২)

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সাথে জড়িত শহীদ বিপ্লবীদের কঠোর ও অন্যায় শাস্তি দেওয়ার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বাংলার বিপ্লবীরা। প্রথমে বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও কালীপদ আইচ সি.আই.ডি ইন্সপেক্টর তারিনী মুখার্জিকে হত্যা করেন। এরপর এই মামলার রায়ে বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের ফাঁসির আদেশ হয়। এর তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিশোধ হিসেবে বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য মেদিনীপুরের দায়রা আদালতের বিচারক চার্লস গার্লিককে ১৯৩১ সালের জুলাই মাসে আদালত কক্ষের ভেতরেই গুলি করে হত্যা করেন। ঘটনার পরপরই কানাইলাল নিজের কাছে থাকা বিষ খেয়ে আত্মাহুতি দেন, যাতে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁর আসল পরিচয় জানতে না পারে। এই জোড়া হত্যাকাণ্ড ১৯৩১-১৯৩২ সালের বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিল।

5. রবার্ট ডগলাস হত্যা: (৩০ এপ্রিল, ১৯৩২)

মেদিনীপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রবার্ট ডগলাস ছিলেন একজন চরম অত্যাচারী ব্রিটিশ কর্মকর্তা। হিজলি বন্দী শিবিরে নিরস্ত্র ও অসহায় রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর পুলিশি গুলিচালনা ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ দলের দুই নির্ভীক ভারতীয় বিপ্লবী— প্রদ্যোতকুমার ভট্টাচার্য এবং প্রভাংশুশেখর পাল দায়িত্ব পান। ১৯৩২ সালের ৩০শে এপ্রিল মেদিনীপুর জেলা বোর্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ মিটিং চলাকালীন তাঁরা ডগলাসের কক্ষে প্রবেশ করেন এবং তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। ডগলাস মারাত্মকভাবে জখম হয়ে মারা যান। ঘটনাস্থল থেকে প্রভাংশুশেখর পালাতে সক্ষম হলেও প্রদ্যোতকুমার ধরা পড়েন এবং ১৯৩৩ সালে তাঁর ফাঁসি হয়।

6. বার্নার্ড ই.জে.বার্জ হত্যা: (২ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩)

জেমস পেডি ও রবার্ট ডগলাস— এই দুই ব্রিটিশ জেলাশাসকের পর পর হত্যার পর বার্নার্ড ই. জে. বার্জ মেদিনীপুরের নতুন জেলাশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি মেদিনীপুরের বিপ্লবী আন্দোলন দমনে পূর্বসূরিদের মতোই নিষ্ঠুর দমননীতি গ্রহণ করেন। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সদস্যরা তাঁকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। ১৯৩৩ সালের ২রা সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর পুলিশ মাঠে একটি স্থানীয় ফুটবল ম্যাচ (ব্র্যাডলি বার্ট টুর্নামেন্ট) চলাকালীন বার্জ যখন তাঁর গাড়ি থেকে নামছিলেন, তখন দুই তরুণ বিপ্লবী— অনাথবন্ধু পাঁজা ও মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। বার্জ ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পাল্টা গুলিতে অনাথবন্ধু তৎক্ষণাৎ শহীদ হন এবং মৃগেন্দ্রনাথ পরদিন হাসপাতালে মারা যান।

7. সি. জি. বি. স্টিভেন্স হত্যা: (১৪ ডিসেম্বর ১৯৩১)

কুমিল্লার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস জি. বি. স্টিভেন্স স্থানীয় জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানো এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানোর জন্য কুখ্যাত ছিলেন। তাঁর এই অত্যাচারের জবাব দিতে ‘যুগান্তর’ দলের দুই দুঃসাহসী স্কুলছাত্রী— শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী এগিয়ে আসেন। ১৯৩১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর সকালে একটি সাঁতার প্রতিযোগিতার অনুমতির আবেদনপত্র সই করানোর উছিলায় তাঁরা স্টিভেন্সের সরকারি দপ্তরে প্রবেশ করেন। স্টিভেন্স যখন দরখাস্তে সই করছিলেন, তখন শান্তি ও সুনীতি চাদরের তলা থেকে রিভলভার বের করে সরাসরি তাঁর বুক লক্ষ্য করে গুলি চালান। ঘটনাস্থলেই স্টিভেন্সের মৃত্যু হয়। কম বয়স হওয়ার কারণে তাঁদের ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এবং ভারতীয় যুবক-যুবতীদের ওপর হওয়া দীর্ঘদিনের অকথ্য নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়ার লক্ষ্যেই মূলত এই সশস্ত্র প্রতিরোধ ও গুপ্ত হত্যার ঘটনাগুলো ঘটেছিল। ভারতবর্ষে চরমপন্থী আন্দোলনের আদর্শের বীজ বপন করেন স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও দয়ানন্দ সরস্বতী। ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠী এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন— “Vivekananda was the Michael Angelo in the realm of spirit.”