|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে মুর্শিদকুলি খাঁ যখন বাংলার নবাব হলেন, মুঘল শাসনব্যবস্থার অরাজকতার অন্ধকার থেকে একটু হলেও বাংলাকে সেদিন স্বাধীনতার আলো দেখিয়েছিলেন। মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় সেই আলোকরেখা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অভাগা মীরকাসিম শেষ চেষ্টা করলেও, সর্বগ্রাসী ইংরেজরা বাংলা তথা ভারতবর্ষ দখলের সোনালী-স্বপ্ন দেখে ফেলে ভাগীরথীর কোলে থাকা ছোট্ট এক পলাশীর প্রান্তরে। কোন সাত নবাবের অদূরদর্শীতায় পত্তন হয়েছিলো ইংরেজ শাসনের, লিখেছেন প্রসেনজিৎ দে।
১. মুর্শিদকুলি খাঁ (সূর্যনারায়ণ মিশ্র)
মুর্শিদকুলি খাঁ। জন্মসূত্রে দক্ষিণী ব্রাহ্মণ। যাকে হাজী ইম্পাহানি নামে একজন মুসলমানের কাছে বিক্রি করা হয়। প্রথম পারস্য; পরে মুর্শীদ ভারতে আসেন। এবং হাজীর মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ খোরাসানীর কাছে রাজস্ব সংক্রান্ত কাজে শিক্ষা নেন। ঔরঙ্গজেবের নজর পড়ে মুর্শিদের ওপর। ১৭০০ সালে হায়দরাবাদের দেওয়ান পদে নিযুক্ত হন। সেসময়ে বাংলার সুবেদার ঔরঙ্গজেবের স্বেচ্ছাচারী ও অর্থলোভী নাতি আমিন-উস-মানির শাসনে বাংলা তিতিবিরক্ত। বেআইনি ভাবে অর্থ উপার্জন করতেন। কিন্তু সম্রাটের আদেশে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে মুর্শিদকুলিকে মেরে ফেলার চেষ্টাও করা হয়। দেওয়ান পদে উন্নীত মুর্শিদকুলি তাঁর নিরাপত্তার ও কাজের সুবিধার জন্য উত্তর বাংলার মুর্শিদাবাদে কার্যালয় স্থানান্তরিত করেন। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সম্রাট বাহাদুর শাহ আমিন-উসমানের পরামর্শে মুর্শিদকুলি খাঁকে ১৭০৮ সালে দাক্ষিণাত্যের পাঠিয়ে দিলেও, বাহাদুর শাহ দুই বছর পর মুর্শিদকুলিকে আবার বাংলার নিয়োগ করতে বাধ্য হন। ফারুখশিয়র বাংলার পদে বসার পর মুর্শিদকুলির ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। ১৭১৭ খ্রি. তিনি দেওয়ানি পদ থেকে বাংলার সুবেদারের পদে উন্নীত হন। অবশ্য এর আগে তিনি উড়িষ্যার সুবেদারী পান।
কাগজে-কলমে দিল্লির বাদশার প্রতি আনুগত্য দেখালেও নবাব হিসেবে তিনি প্রায়ই স্বাধীন নীতির মতোই আচরণ করতেন। এভাবেই মুর্শিদকুলি বাংলার স্বাধীন নবাবের পত্তন করেন।তাঁর শাসন ও শাসনকার্যের কৃতিত্ব উল্লেখ করে স্যার যদুনাথ সরকার তাঁকে “এক গৌরবময় অসামরিক কর্মচারী (Glorious civil Servent)” বলে অভিহিত করেছেন।
মুর্শিদকুলি খাঁর শাসন সম্পর্কে আমরা ” আহ্বান-ই-আলমগিরী”, “তারিখ-ই-বাংলা”, গোলাম হোসেন সলিমের “রিয়াজ-উস-সালাতিন” বই থেকে জানতে পারি। মুর্শিদকুলি খাঁর শাসনকাল বাংলার ইতিহাসে একটি যুগের অবসান এবং একইসাথে একটি নতুন যুগেরসূচনা হয়। বাংলার রাজস্ব ও শোষণ নীতি চলছিল তিনি তার অবসান ঘটান। তাঁর আমলেই বাংলা মুঘল শাসন থেকে মুক্ত হয়। তিনি ছিলেন বাংলার নবাবির প্রতিষ্ঠাতা।
২. নবাব সুজাউদ্দিন খান (১৭২৭ – ১৭৩৯)
মুর্শিদকুলি খাঁর কোনও পুত্র সন্তান না থাকায় তার কন্যা বেগম জিন্না নিশার সঙ্গে সরকারের কর্মচারী সুজাউদ্দিনের বিয়ে হয়। এক্ষেত্রে সমস্যা হল মুর্শীদকুলি খাঁ, তার দৈহিত্র সরফরাজ খানকে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। কিন্তু সুজাউদ্দিন তার শশুরের মৃত্যুর পর মনোনীত উত্তরাধিকারের বিরোধিতা করে সরফরাজ খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই মুর্শিদাবাদের নবাবের সিংহাসনে বসে একটি বাদশাহী ফরমান জোগাড় করে তার নবাবী অধিকার বৈধ করেন। তার প্রবীণ পরামর্শদাতা ছিল হাজী আহমেদ তিনি আলীবর্দী খানকে বিহারের সুবিধার নিযুক্ত করেন।
সুজাউদ্দিনের আমলে ইংরাজ, ফরাসি, ডাচ বাংলায় ব্যবসা চালাতে থাকে তবে ১৭৪৪ সালে নবাবের সেনাদল তাদের উৎখাত করলে বিদেশী বণিকরা বিদায় নিতে বাধ্য হয়। সমকালীন ঐতিহাসিক গোলাম হোসেনের মতে, সুজাউদ্দিন ছিলেন নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার পরায়ন শাসক। সুজাউদ্দিন একমাত্র নবাব যিনি শাসনকার্যের সুবিধার জন্য বাংলাকে বাংলা থেকে উড়িষ্যাকে দুই ভাগে ভাগ করেন। তাঁর আমলের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কম ছিল ।কিন্তু নায়েব নাজিমদের ওপর বেশি নির্ভরশীলতা বাড়াতে গিয়ে হাজী আহমেদের পরামর্শে চলতে গিয়ে অলস প্রশাসন বিপথে এবং নবাবী সাম্রাজ্য বিপদে পড়তে শুরু করে।
৩. নবাব সরফরাজ খান (১৭৩৯–১৭৪০)
সুজাউদ্দীনের মৃত্যুর পর তার পুত্র সরফরাজ খান বাংলার সিংহাসনে বসেন। ধর্মপরায়ণ সরফরাজকে মুর্শিদকুলি উত্তরাধিকারী হিসেবে বাছলেও, পিতা সুজাউদ্দৌলার পরে বাংলার মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে তিনি বসতে পারেননি। সুজাউদ্দীনের মৃত্যুর পর মাত্র এক বছর কাল রাজত্ব করার সময়ে প্রশাসনিক ও উচ্চপদস্থ আমলাদের জন্য তিনি সিংহাসনচ্যুত হয়ে নিহত হন। সরফরাজ খানের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার জন্য সমস্যা সৃষ্টি হয়। আলীবর্দী ও তাঁর বড়ভাই হাজী আহমদের উপর তিনি অন্ধভাবে সমস্ত কাজে নির্ভর করতেন। এর ফলে উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের ক্ষোভ বাড়ে। হাজী আহমদের মেয়ের প্রতি অবৈধ আসক্তির ফলে নবাব সরফরাজ নিজের বিচারশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এই সুযোগে আলীবর্দী খান পাটনা থেকে সেনাদল নিয়ে সংঘর্ষের জন্য এগিয়ে আসেন। হাজী আহমদের ভ্রাতুষ্পুত্র নিজেই মোহরা নবাব পক্ষে আলীবর্দীর ষড়যন্ত্রের কথা জানাতে পারেননি। অবশেষে সুযোগ বুঝে হাজী আহমদ নিজের ভাই আলীবর্দীর সঙ্গে হাতমিলিয়ে গিরিয়ার যুদ্ধে ১৭৪০ সালে ১০ এপ্রিল সরফরাজকে পরাজিত ও নিহত করেন।
৪. নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০–১৭৫৬)
মুর্শিদকুলি খানের দৌহিত্র সরফরাজ খানকে হত্যা করে ১৭৪০ বাংলার সিংহাসনে বসেন নবাব আলীবর্দী খান। অষ্টাদশ শতকে পতনশীল মুঘল সাম্রাজ্যের সুযোগ নিয়ে যে সকল ভাগ্যসন্ধানী তরবারির সাহায্যে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল জয় করেন তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন আলীবর্দী খান। তিনি ছিলেন আরব জাতীয়। পিতামহ ছিলেন ঔরঙ্গজেবের মনসবদার। আলীবর্দী খানের আসল নাম ছিল মীর্জা মহম্মদ। নবাব সুজাউদ্দীন তার যোগ্যতায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ‘আলীবর্দী খান’ উপাধি দেন এবং ১৭৩৩ সালে নায়েব নাজিম নিযুক্ত করেন। আলিবর্দি মুর্শিদাবাদের সামরিক সংগঠনে জগৎশেঠ, আলমচাঁদের সামিল ছিলেন। তিনি তার সিংহাসন লাভের বৈধতা স্থাপনের জন্য দিল্লির বাদশাহের ফরমান দ্বারা বাংলার সুবেদার খেতাব লাভ করেন। ১৭৪১ সালে প্রথম জঙ্গলমহলে এবং উড়িষ্যার উপর যুদ্ধে দৌলতজং জঙ্গলে পলায়ন করেন।
আলীবর্দী উড়িষ্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে ১৭৪২ সালে রাখুজি ভোঁসলে বাংলা আক্রমণ করেন। কিন্তু আলীবর্দীর সুদক্ষ কৌশলে তিনি সাময়িক পিছু হটেন। পরের বছরই আবার ১৭৪৩ সালে রঘুজি আক্রমণ করলে বালাজী বাজিরাওয়ের সহযোগিতায় তিনি রঘুজি ভোঁসলেকে বিতাড়িত করেন।
১৭৪৪ সালে আবার রঘুজির সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত বাংলায় আসলে, আলীবর্দী আফগান সেনাপতি মুস্তাফা খাঁর পরামর্শে নিজ শিবিরে ভাস্কর পণ্ডিতকে হত্যা করেন। এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে রঘুজি পুনরায় বাংলা আক্রমণ করলে পাঁচ বছর ধরে (১৭৪৫–৫০) যুদ্ধ চলে। যুদ্ধে পিছু হটে ১২ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ও উড়িষ্যা হস্তান্তর করে মঙ্গল-চুক্তি স্থাপন করে বাংলাকে বাঁচান।
এই সময় ইংরেজ, ডাচ স্থায়ী বণিকদের সঙ্গে আলীবর্দীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন বাংলার নবাবী শাসনকালের মধ্যে আলিবর্দিকে ‘শ্রেষ্ঠ নবাব’ বলে উল্লেখ করেছেন। আবার ডঃ দীনেশ গুপ্তের মতে, “আলীবর্দীর আমলেই বাংলার সুবায় ধ্বংসের সূচনা হয়।” আলীবর্দী খানের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। তিনি কন্যা আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজদ্দৌলাকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। কিন্তু তাঁর জীবনদশায় এই বাংলার নবাব পদের সমস্যার সমাধান হয়নি।
৫. নবাব সিরাজদ্দৌলা (১৭৫৬–১৭৫৭)
আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর ১৭৫৬ সালের ১০ই এপ্রিল তার মেয়ে আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব পদে বসলেও ঘসেটি বেগম তার সিংহাসন লাভের বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এদিকে নবাব সিরাজও সমস্ত চক্রান্ত ধ্বংস করার জন্য ঘসেটি বেগমকে বন্দী করে সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করলে, সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়।
যুবরাজ অবস্থায় সিরাজ ফরাসী ও ডাচদের চেয়ে ইংরেজদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে সম্পর্কের অবনতি হয়। কারণ সেসময় দস্তক ব্যবহার করে বিনা শুল্কে বিদেশী বণিকরা উপঢৌকন দিয়ে ব্যবসা করার নিয়ম ছিল। কিন্তু ইংরেজরা তা করতেন না। পরবর্তীকালে কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দেওয়া এবং দুর্গ নির্মাণ ও সংস্কারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চরমে পৌঁছায়। ইংরেজরা এই সময় দুর্গ নির্মাণ করলে তা নবাবের আদেশের অমান্য করে এবং সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। ইতিমধ্যে নবাবের দূত নারায়ণ দাসকে নিগ্রহ করায় নবাব কয়েকজন ইংরেজকে বন্দী করেন এবং ১৭৫৬ সালের ১৬ই জুন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করে ১৪৬ জন ইংরেজ সৈনিককে ১৮ ফুট লম্বা এবং ১৪ ফুট চওড়া একটি ঘরে আটকে রাখায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ১২৩ জন মারা যায়। যা ইতিহাসে ‘অন্ধকূপ হত্যা’ (Black Hole Tragedy) নামে কুখ্যাত।
এরপর নবাব কলকাতার নাম আলীনগর নাম দেন। কিন্তু সিরাজ মুর্শিদাবাদে ফেরত গেলে ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজ সৈন্যরা (১৭৫৭ খ্রি. ২রা জানুয়ারি) ফের কলকাতা দখল করেন। অবশেষে সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ মীরজাফরের সহযোগিতায় ১৭৫৭ খ্রি. ১০ই জুন গোপন সন্ধির মাধ্যমে সিরাজকে হত্যার ছক তৈরি করে ২৩শে জুন নবাবকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। সিরাজ পালিয়ে যায়। চুক্তি অনুযায়ী ইংরেজদের হাতের পুতুল করে মীরজাফরকে সিংহাসনে বসান।
৬. নবাব মীরজাফর (১৭৫৭–১৭৬০)
পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ী ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ ১৭৫৭ সালে ২৬শে জুন গোপন চুক্তির মাধ্যমে ২ লক্ষ ৩৪ হাজার ঘুষ দিয়ে বাংলার নবাব পদে বসেন। এছাড়াও কোম্পানির সৈন্যদের ৩০ থেকে ৮০ হাজার পাউন্ড এবং নৌ-সেনাপতিদের ২৫ লক্ষ টাকা ঘুষ দেন। নবাব মীরজাফর ভেবেছিলেন, কোম্পানির প্রাপ্য মিটিয়ে দিলেই চুক্তিমতো তিনি বাংলায় স্বাধীন নবাব হিসেবে শাসনকার্য চালাবেন। সিংহাসনে বসলেও মীরজাফরের নেতৃত্ব বেশিরভাগ কর্মচারী মেনে নিতে চাননি। এরা হলেন রায়দুর্লভ, বিহারের দেওয়ান রামনারায়ণ, মেদিনীপুরের রাজারাম সিংহ প্রমুখ।
ক্লাইভ এই দ্বন্দ্ব টিকিয়ে রাখতে চাইলে আপাতত মীমাংসা করেন। অন্যদিকে দিল্লির বাদশাহ শাহ আলম মীরজাফরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি ইংরেজদের শরণাপন্ন হন। এইভাবে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যস্ত ও বিদ্ধস্ত মীরজাফরের কোন স্বাধীনতা ও সম্মান ছিল না। পরাক্রমহীন, সামরিকশক্তি শূন্য, আর্থিক দেনায় বিপর্যস্ত মীরজাফর কেবলমাত্র আত্মরক্ষার জন্য ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা প্রতি মাসে কোম্পানিকে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। এভাবে আস্তে আস্তে মীরজাফরের দেনার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ লক্ষ টাকা। মীরজাফর এই অবস্থায় প্রতিকারের জন্য ওলন্দাজ বণিকদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার মনস্থ করেন। কিন্তু ইংরেজদের সতর্ক চোখ নবাবের উপর ছিল। ওলন্দাজরা প্রবেশের চেষ্টা করলে ১৭৫৯ খ্রি. বিদেরা যুদ্ধে পরাস্ত হন।
অবশেষে সীমাহীন অর্থের দাবী পূরণ করতে না পারলে ইংরেজ গভর্নর ভ্যানসিটার্ট (Vansittart)-এর নেতৃত্বে মীরজাফরকে ১৭৬০ সালে পদচ্যুত করা হয়।
৭. নবাব মীরকাশিম (১৭৬০–১৭৬৪)
ইংরেজ গভর্নর ভ্যানসিটার্টের সঙ্গে গোপন চুক্তির মাধ্যমে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ১৭৬০ সালে মীরকাশিম বাংলার মসনদে বসেন।তিনি ভ্যানসিটার্ট সহ অন্যান্য ইংরেজ আধিকারিকদের সর্বমোট ২৯ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন।
মীরকাশিমের লক্ষ্য ছিল প্রাণপণে স্বাধীনভাবে শাসন করা। অপরদিকে ইংরেজদের উদ্দেশ্য ছিল নবাবকে একটি ক্রীড়নকে পরিণত করা। ওয়ারেন হেস্টিংস মীরকাশিমকে সম্মানীয় মনে করতেন এবং কোনোভাবেই চালাতে পারবেন না বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। কিন্তু মীরকাশিম সিংহাসনে বসার পর নিজস্ব নিয়মে রাজ্য শাসন করতে শুরু করেন। ক্রমশ রাজস্ব বৃদ্ধি করেন এবং দুর্নীতিপরায়ণদের শাস্তি প্রদান শুরু করেন।
এরপর মীরকাশিম তার রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তরিত করেন এবং এরপর তিনি সামরিক সংস্কারের জন্য আর্মেনীয় সেনাপতির সাহায্য নেন এবং গ্রেগরিকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। সেইসময় তিনি মুঙ্গেরে অস্ত্র তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। কিন্তু ইংরেজ সেনারা বাংলার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা লাভ করার পর তা হারাতে রাজি ছিল না। তাই আরও বেশি বেশি জেলার রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা ছিল।
ইতিমধ্যে মাসুলক ও বাণিজ্য নিয়ে নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের তীব্র মতবিরোধ শুরু হয়। ইতিমধ্যে ওয়ারেন হেস্টিংস ও মীরকাশিমের সঙ্গে মুঙ্গেরে চুক্তি সম্পাদিত হয় কিন্তু ভ্যানসিটার্ট এই সন্ধি নাকচ করলে মীরকাশিম ক্ষুব্ধ হয়ে সকল বিদেশী বণিকদের শুল্ক আদায় বন্ধ করে দেন। ফলে ইংরেজদের কলকাতা কর্তৃপক্ষ ক্ষিপ্ত হয়। মীরকাশিমকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা শুরু হয়।
মীরকাশিমও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন কিন্তু সেনাদল ছিল অপর্যাপ্ত। অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা, বাহাদুর দ্বিতীয় শাহ আলম এবং মীরকাশিমের এই ত্রিপক্ষীয় মৈত্রীবাহিনী ১৭৬৪ সালে ২৩শে অক্টোবর বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হন।
মেলসন তাঁর “Ten Decisive Battles of India” বইয়ে বক্সারের যুদ্ধকে নির্ণায়ক যুদ্ধ বলেছেন। বক্সারের যুদ্ধের পর ক্লাইভকে লর্ড উপাধি দেওয়া হয়। এভাবেই বক্সারের যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসে ব্রিটিশ যুগের সূচনা করে।
লেখক : সহশিক্ষক,
ধুলাই রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠ,
সোনামুখী, বাঁকুড়া
