Getting your Trinity Audio player ready...

উনিশ শতকে যেসব মনীষী বিজ্ঞান ও গবেষণায় নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন তাঁদের অনেকেই আমাদের অজানা। শুধু বিজ্ঞান নয়, এঁরা এক একেকজন বিপ্লবী, সমাজ সংস্কারক, আবার সমাজসেবী, মানব দরদী। এমন পাঁচ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লিখেছেন নবারুণ মন্ডল

১. প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (১৮৬১-১৯৪৪)
ছোটবেলা থেকে ভগ্ন স্বাস্থ্য। পড়াশুনায় দু’বছর ব্যাঘাত ঘটলো। সেই সময়টা গ্রামের বাড়িতে গভীর পড়াশোনা শুরু করলেন ইংরেজি, বাংলাও সংস্কৃত সাহিত্যের উপর। পাশাপাশি গ্রীক ও ল্যাটিন শিখেছিলেন। এতগুলো ভাষায় দখল থাকায় সেসময় সাত হাজার টাকার গিলক্রিস্ট বৃত্তি পান। ফলে সোজা চলে যান এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় বিএ পড়তে। বি এ পাশের দু বছরের মধ্যে ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ডি.এস.সি সম্মান লাভ করেন।
তারপর দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়নের সহ অধ্যাপক হন। পরীক্ষাগারে একদিন ইডিও মিটার নলে পারদকে পরিশ্রুত করছিলেন। দেখলেন, লঘু নাইট্রিক আ্যসিডে পারদ পরিশ্রুত হয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। আরো লক্ষ্য করলেন নাইট্রোজেন পেন্টাক্সাইড সমৃদ্ধ শীতল ও লঘু নাইট্রিক আ্যসিড পারদের সঙ্গে বিক্রিয়া করে পারদের উপর হলুদ রঙের আস্তরণ তৈরি করেছে। ওই হলুদ রঙের পদার্থটি হল মারকিউরাস নাইট্রাইট । ১৮৯৫ এ এই আবিষ্কার দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ল। অবিবাহিত মানুষটি সারা জীবন নিজেকে বিজ্ঞান ও দেশের কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন। নিজের মাইনের টাকা জমিয়ে ১৮৯২ সালে বেঙ্গল কেমিক্যালস প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের হাতধরে পরবর্তীকালে সত্যেন বোস, মেঘনাদ সাহার মতো প্রচুর বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী হয়েছেন।

২. আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু  (১৮৫৮-১৯৩৭)
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান ধারার মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজটি করেছিলেন করেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রাইপস সহ বি এ এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি পাস করে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজে সহ অধ্যাপক পদে যোগ দেন। সমপদে ইংরেজদের থেকে কম বেতনের প্রতিবাদে তিন বছর বিনা বেতনে অধ্যাপনা । বিনা তারে বেতার বার্তার আবিষ্কর্তার সম্মান তাঁরই পাওয়ার কথা ছিল। বঞ্চনা করা হয়েছিল। মার্কোনির আগেই তিনি বেতার আবিষ্কার করেছিলেন তার নিশ্চিত প্রমাণ আছে। গাছেদের প্রাণ আছে তিনি প্রথম লক্ষ্য করেন। তার বিদ্যুৎ তরঙ্গের আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। ক্রেসকোোগ্রাফ যন্ত্র তাঁরই আবিষ্কার। ১৯১৭ সালে তিনি গবেষণা চালানোর জন্য বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। যেটা এশিয়ার প্রথম আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

৩.  মেঘনাথ সাহা (১৮৯৩-১৯৫৬)
বাবার ছিল মুদির দোকান। সেই দোকান সামলানোর ফাঁকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। ১৯১১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিতে অনার্স নিয়ে পড়াকালীন বিজ্ঞান-গুরু হিসেবে পেয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়,জগদীশচন্দ্র বসু, সর্বপরি প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মতো শিক্ষকদের। সহপাঠী হিসেবে পাশে থাকতো জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, সত্যেন্দ্রনাথ বোস, জ্ঞানেন্দ্র মুখোপাধ্যায় পুলিনবিহারী সরকার। তার এক ক্লাস সিনিয়র ছিলেন প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ। প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথম আলাপ হয়েছিল সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে। তখনও সুভাষ ‘নেতাজি’ হয়ে ওঠেননি। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে এমএসসি পরীক্ষায় সত্যেন্দ্রনাথ ও মেঘনাদ দুজনই হলেন প্রথম। ওই সময়ে অনুশীলন সমিতির দেশমায়ের কাজে বাঘাযতীন প্রায় যাতায়াত করতেন তাঁর মেসে। বরাবর ইংরেজদের সন্দেহর নজরে ছিলেন বিপ্লবী ‘মেঘনাদ’।
সৌরমন্ডল ও নক্ষত্রের আয়নে তাপমাত্রা ও চাপের প্রভাব বিশ্লেষণ করে ১৯২০ সালে সাহা আয়ন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এই তত্ত্বের সাহায্যে সূর্য রশ্মির বর্ণালীর ব্যাখ্যা ও সৌর কলঙ্কের কারণ জানা যায়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে সল্টলেকে তাঁরই উদ্যোগে ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স তৈরি হয়। যার বর্তমান নাম সাহা ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়। তিনি ছিলেন দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের অন্যতম কারিগর।

৪. সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৮৯৪-১৯৭৪)
অসাধারণ মেধা ও স্মৃতিধর, একবার যা পড়তেন, আত্মস্থ হয়ে যেত। এন্ট্রান্স পরীক্ষার টেস্টে জ্যামিতির ‘এক্সট্রা’- দু-তিন রকম বিকল্প পদ্ধতিতে সমাধান করায় ১০০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছিলেন ১১০। পড়াশুনায় যেমন চৌকস তেমনি দুষ্টুমিতে ও পিছিয়ে ছিলেন না। এমএসসি পরীক্ষা ১৯১৫ সালে সত্যেন্দ্রনাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯২ নম্বর পেয়ে রেকর্ড স্থাপন করেছিলেন এখনো পর্যন্ত সেই রেকর্ড অক্ষুন্ন রয়েছে। ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিজ্ঞান কলেজ। ওই কলেজে পদার্থবিদ্যা ও গণিত এই দুই বিষয়ের ক্লাস নিতেন।
তখন বয়স ২৭ বছর, সত্যেন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। জার্মানির প্রখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্কের গবেষণাপত্র পড়ে সত্যেনের মনে হলো, প্লাঙ্কের এই তাত্ত্বিক গবেষণার ভিত্তি হল আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ। প্লাঙ্কেরএই জটিল গবেষণার গাণিতিক সমীকরনের সিঁড়ি ভেঙে প্রমান করলেন প্লাঙ্কের তত্ত্বের একটি ভ্রান্তি। এই বিষয়ে চার পাতার এক প্রবন্ধের নাম দেন ‘প্লাঙ্কের সূত্র ও আলোক কোয়া প্রকল্প’। ভারতীয় জার্নালে এটি প্রকাশ করে পাঠালেও প্রবন্ধটি ‘ছাপার অযোগ্য’ বলে ফিরত আসে। তাতে তিনি দমে না গিয়ে পরপর বহু বিদেশী জার্নালে প্রবন্ধটি পাঠান সব জায়গাতেই অমনোনীত হলে; ওই চার পাতার প্রবন্ধটি পাঠিয়ে দিলেন খোদ আইনস্টাইনের কাছে।আইনস্টাইন ইংরেজি থেকে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে প্রবন্ধটি বিখ্যাত এক বিজ্ঞান জার্নালে। এরপর আলবার্ট আইনস্টাইনের সাথে যৌথভাবে ‘বোস আইনস্টাইন সংখ্যায়ন’ তত্বে আবিষ্কার হলো, ‘বোসন কণা’, যা পার্টিকেল ফিজিক্স এ চর্চার বিষয়।

৫. মহেন্দ্রলাল সরকার (১৮৩৩-১৯০৪)
হাওড়া জেলার পাইকপাড়া গ্রামে জন্ম।মাত্র পাঁচ বয়সে হলেন পিতৃহারা। তার তিন বছর পর ছোট মহেন্দ্রর মা কলেরায় মারা গেলেন। দুই মামার কাছে বেড়ে ওঠা। গৃহ শিক্ষকের কাছে ইংরেজি ভালোভাবে শেখার ফলে হেয়ার স্কুলে ভর্তি হতে পারলেন। বিজ্ঞানের প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। মেডিসিন নিয়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৮৬১ সালে মেডিসিন ১৬ চিকিৎসা ও ধাত্রীবিদ্যা অনার্স সহ এল.এম.এস পরীক্ষায় পাস করলেন। ১৮৬৩ সালে তিনি এম.ডি ডিগ্রি করলেন। তৎকালীন এলোপ্যাথি চিকিৎসায় কিছু সীমাবদ্ধতা দেখে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিতে আগ্রহী হন। দেশবাসীকে
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় উৎসাহিত ও সুযোগ দিতে যাদবপুরে ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে ১৯৩০ সালে সি ভি রমন তাঁর বিখ্যাত ‘রমন এফেক্ট’ আবিষ্কার করে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। তাঁরই পরামর্শে সেসময় ব্রিটিশ সরকার মেয়েদের বিয়ের বয়স ন্যূনতম ১৬ বছর নির্ধারণ করে।
‘কথামৃত’র পাতায় পাতায় ভরা রয়েছে রামকৃষ্ণদেব ও তার চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকারের বহু কথোপকথন। নিজের কর্ম কৃতিত্বে ও দক্ষতায় সে যুগের প্রথিতযশা এই এলোপ্যাথি তথা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসককে ইতিহাস মনে রেখেছে আজীবন বিজ্ঞান অনুসন্ধান, বিজ্ঞান সভার প্রতিষ্ঠার জন্য এবং শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসা হিসাবে।

লেখক: সহশিক্ষক,
আড়িয়াদহ কালাচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়, ২৪ পরগনা (উঃ)