|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
ছেলেবেলা থেকে আমরা শুনে এসেছি, “লোহার সেরা টাটা, জুতোয় সেরা বাটা”। বড় হয়ে বুঝলাম, এই দুই শিল্প গোষ্ঠী আসলে তাঁদের পদবী নামেই খ্যাত। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি জামসেদজি নুসেরয়ানজি টাটা’র হাত ধরে সেদিনকার বোম্বাইতে গড়ে ওঠে এই শিল্প গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এঁদের সাথেই বিড়লা, গোয়েংকা, হাল আমলের আম্বানি, আদানি এঁদের আমরা চিনি। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন এই বাংলাতেই বাঙ্গালী শিল্পোদ্যোগীদের রমরমা দেশ ছাড়িয়ে বিলেতের মাটিতেও ছাপ রেখেছিল। সেইরকম সাত বাঙ্গালী শিল্পপতিদের কিছু কথা লিখেছেন অম্বরীশ দত্ত
১. আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (১৮৬১- ১৯৪৪)
– রবীন্দ্রনাথ তার সম্পর্কে লিখেছিলেন, “সংসারে জ্ঞানী তপস্বী দুর্লভ নয়, কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে চরিত্রে ক্রিয়া প্রভাবে তাকে ক্রিয়াবান করতে পারে এমন মনীষী সংসারে কদাচ দেখতে পাওয়া যায়।” ছিলেন খুলনার রাড়ুলি গ্রামের জমিদার বাড়ির ছেলে, যিনি পরবর্তীকালে ব্রিটিশ পুলিশের কাছে হয়ে উঠেছিলেন “বিজ্ঞানীর বেশে বিপ্লবী”। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, প্রকৃত অর্থে বিজ্ঞান ভিক্ষু। মারকিউরাস নাইট্রাইট সহ ১২ টি যৌগিক লবন ও ৫ টি থায়োএস্টারের আবিষ্কারক তিনি। একটা সময় যখন তাঁর মাসিক আয় ছিল প্রায় ২ হাজার টাকা, কিন্তু নিজের জন্য খরচ করতেন দিনে ১ পয়সা! রোজগারের সবটাই প্রায় দান করে দিতেন।
এ হেন বিজ্ঞান তপস্বী ১৮৯২ সালে মাত্র ৭০০ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন ভারতের প্রথম ওষুধ কোম্পানি, ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফারমাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড’। তৈরি হতে লাগলো নানান জীবনদায়ী ওষুধ, পারফিউম। পরে এখান থেকেই বের হতে লাগলো, ফিনাইল, ন্যাপথলিন। পরাধীন ভারতে স্বদেশী আন্দোলনের যুগে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ শাসকের সামনে ছুঁড়ে দিয়েছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
২. ডা. যোগেশ চন্দ্র ঘোষ: (১৮৮৭-১৯৭১)
– স্বদেশী যুগের আরও এক শিল্পোদ্যোগীর গল্প শোনাই। স্বদেশী আন্দোলনের সময় বিলিতি জিনিসের ব্যবহার বাদ। দেশীয় জিনিসের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেলো। একইভাবে বাড়লো আয়ুর্বেদিক ওষুধের চাহিদা। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রজ্ঞ যোগেশ চন্দ্র ঘোষ ১৯১৪ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করলেন ‘সাধনা ঔষধালয়’। ঢাকা ছাড়িয়ে এরপর তৎকালীন কলিকাতা, চিন এমনকি আফ্রিকাতেও পৌঁছে যায় ব্যবসা। সারিবাদি সালসা, মৃত সঞ্জীবনী সুধা, বিউটি ক্রিম, দশনা সংস্কার, কূটজারিস্ট, মহা দ্রাক্ষারিস্ট, মকরধ্বজ, চ্যবনপ্রাস প্রভৃতি ওষুধের চাহিদা সেসময় ছিল আকাশ ছোঁয়া। তাঁর এই ওষুধ কোম্পানি শুধু রোগের নিরাময়ের ঠিকানা নয়, ছিল স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান।
৩. আলা মোহন দাস: (১৮৯৫-১৯৬৯)
– এবার আরও এক বাঙ্গালীর গল্প। উঁহু গল্প নয়, সত্যি। আজকের হাওড়ার দাসনগরের নাম সবার চেনা। যার নামে এই শিল্প তালুক, তাঁর নাম আলা মোহন দাস। ১৮৯৫ সালের হাওতার আমতায় খিলার বড়ুইপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। ছোট থেকেই অত্যন্ত দারিদ্রের মধ্যে জীবন কাটাতে হয়েছে। ছোটবেলায় একবার গুরুতর অসুস্থ হলে কবিরাজ মশাই বললেন, “এই ছেলে তো মারা গেছে”! শ্মশানে নিয়ে গেলে দেখা গেল, আজায় দেহে প্রাণ আছে। তাঁর ঠাকুমা বললেন এই ছেলে ‘অ্যালা’ ছেলে। সেই থেকে তাঁর নাম আলা, আলা মোহন দাস। পিতৃদত্ত নাম সুরেন্দ্র মোহন দাস। মাত্র ১৪ বছর বয়সে মুড়ি-খই ফেরি দিয়ে যার কর্মজীবন শুরু, তিনি একদিন হয়ে উঠলেন হাওড়া কেমিক্যাল ফ্যাক্টরির মালিক। মাঝের দিনগুলো মজুর, সেলস ম্যানের মতো তাঁকে কিনা করতে হয়েছে! এসব কাজ করেই সামান্য পুঁজি জমিয়ে তৈরি করলেন হাওড়া কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি। এর পর ইন্ডিয়া মেশিনারি কোম্পানি, ভারত জুট মিট, আরতি কটন মিল তাঁর হাতে তৈরি। নিজস্ব ব্যাঙ্ক, হাওড়া ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি সবই ছিল তাঁর হাতে তৈরি। এ হেন বাঙ্গালী শিল্পপতির নাম সেই সময়ে দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
৪. হেমেন্দ্র মোহন বসু: (১৮৬৬-১৯১৬)
– একটা সময়, যখন বাঙ্গালী মেয়েদের কেশ সজ্জার শেষকথা ছিল, ‘কুন্তলীন তেল’। সুগন্ধি নিয়ে গবেষণা করা ছিল হেমেন বাবুর নেশা। পরে সেটাই ব্যবসা হয়ে দাঁড়ায় হেমেন্দ্র মোহন বসুর কাছে। নাম দিলেন ‘দেলখোস’। সেই তিনিই একদিকে যেমন মোটর গাড়ি সারানোর ওয়ার্কশপ খুললেন, তেমনি তিনিই প্রথম বাঙ্গালী যিনি ১৯০৩ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন, সাইকেল কোম্পানি ‘এইচ বোস এন্ড কোং সাইকেল’। পাশাপাশি, এই সাইকেল কোম্পানিটি ভারতে রোভারস সাইকেলের ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বও নেয়।
অটোক্রোম লুমিয়ার স্লাইড ব্যবহার করে কালার ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রেও ভারতে পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। ‘স্পোর্টস ইউনিয়ন অব ক্যালকাটা’ও স্থাপন করেন ক্রীড়ামোদী এই ব্যক্তি। ‘কুন্তলীন প্রেস’ নামের ছাপাখানা তাঁরই সৃষ্টি। তবে বাঙ্গালীর শিল্প জগতে তিনি যেজন্য আরও একটি বিশেষ কারণে চির স্মরণীয় হয়েছেন তা হল, প্রথম বাঙ্গালী হিসেবে হেমেন্দ্র বসু গ্রামোফোনের সিলিড্রিকাল রেকর্ডস আনেন ‘এইচ বোসেস রেকর্ডস’ এর ব্র্যান্ড।
৫. স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৪- ১৯৩৬)
– উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রাম ভ্যাবলা। সেই গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম স্যার রাজেন্দ্রনাথের। ঠিকাদারি কারবার দিয়ে কর্মজীবন শুরুর পরে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন এক দুর্দান্ত আর্কিটেক্ট এবং ব্রিজ-সড়ক ইত্যাদি নির্মাণ শিল্পী। মারটিন এন্ড কোম্পানির হয়ে কাজ করতে করতে একদিন হয়ে ওঠেন সেই সংস্থারই সরবময় কর্তা। প্রতিষ্ঠা হল “মারটিন এন্ড বার্ন” কোম্পানির। এই বিশিষ্ট বাঙ্গালী শিল্পপতির হাতেই নির্মিত হয়েছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সৌধ। পলতা ওয়াটার ওয়ার্কস থেকে রাজভবনের বিপরীতে যে এসপ্লানেড ম্যানসন, বি বা দী বাগের চার্টার্ড ব্যাঙ্ক বিডিং থেকে মহীশূর প্যালেস, সবের কারিগর স্যার রাজেন্দ্র। রানাঘাট, কৃষ্ণ নগর, বারাসাত, বশিরহাট রেল লাইনের কাজ ও তাঁর অনন্য কীর্তি। তবে আপামর বাঙ্গালীর কাছে হাওড়া ব্রিজ বা রবীন্দ্র সেতুর নক্সার কাজ বা বেলুড়ে রামকৃষ্ণ মিশন মঠের নক্সার কাজ যে তাঁরই অমর সৃষ্টি সে কথা আমরা ক’জন জানি!
৬. সুরেন্দ্র মোহন বসু: (১৮৮২- ১৯৪৮)
– স্বদেশী যুগে ইংরেজি পন্য বয়কট করার সাথে সাথে তার বিকল্প ভারতীয় পন্য বানানো ছিল এক মহাকাব্যিক যুদ্ধের উপাখ্যান। জলরোধক কাপড় বা ওয়াটার প্রুফ জিনিসের একচেটিয়া দখল ছিল ইংরেজদের। বার্কলে ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত সুরেন্দ্রমোহন কারাবন্দী অবস্থায় স্বদেশি ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভাবলেন, কীভাবে বানানো যায় ওয়াটার প্রুফ কাপড়। হাঁস যেমন জলে ভিজলেও তার পিঠে জল দাঁড়ায় না, সেই ভাবনায় প্রতিষ্ঠা হল আজকের ‘ডাকব্যাক’ ব্র্যান্ডের। ১৯৪০ সালে ‘বেঙ্গল ওয়াটার প্রুগ কোম্পানি’ তাঁর হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যদের ওয়াটারপ্রুফ সরঞ্জাম ডাকব্যাক তৈরি করতে লাগলো। এমনকি তারা ফাইটার পাইলটদের জন্য অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি স্যুটও বানালো। আজও বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে ডাকব্যাক ব্র্যান্ডের রেনকোট, গামবুট ও ব্যাগের পাশাপাশি তারা এয়ার বালিশ, আইসব্যাগ ও স্কুলব্যাগ যে ব্যবহার হচ্ছে তার স্রষ্টা এক বাঙালি।
৭. গৌর মোহন দত্ত: (১৯০৯-১৯৬১)
– এই অমোঘ ক্যাচলাইন- “বঙ্গ জীবনের অঙ্গ”। প্যাচ ঘোরানো কালো ছিপি খুললেই সেই সবুজ রঙের টিউবের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা বিশেষ গন্ধ, বাঙালির প্রসাধনী, বাঙালির কাটা-ছেড়া থেকে একশো উপসর্গের ঔষধি মলম আজ প্রায় শতবর্ষের দোরগোড়ায়। আজও বাঙালির ড্রেসিং টেবিল থেকে ওষুধের ডাব্বায়, একই ভাবে রয়ে গেছে। জি ডি ফারমাসিউটিক্যালস এর প্রতিষ্ঠাতা গৌরব মোহন দত্ত ছিলেন এমনই এক শিল্পপতি যিনি স্বদেশী আন্দোলনের যুগে বিদেশি প্রসাধনীর বিরুদ্ধে বানালেন একেবারে ভারতীয় তথা বাঙ্গালী ব্র্যান্ড আজেকের ‘সুরভিত আন্টিসেপ্টিক ক্রিম বোরোলিন’। আজকের দিনে যে আত্ম নির্ভর ভারতের স্লোগান বিভিন্ন জায়গায় শুনতে পাই তার পুরধা পুরুষ ছিলেন, গৌরব মোহন দত্ত। তাঁর এই স্বদেশী ব্রান্ড এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের দিনে উনি নাকি ১ লক্ষ টিউব বোরোলিন বিনামূল্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
এইসব বিস্মৃত প্রায় বাঙ্গালী শিল্পদ্যোগী আজও তাঁদের যুগের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন ধ্যান ধারনা এবং স্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে। স্বদেশী শিল্প স্থাপনের যে সাহ্স ও প্রত্যয় দেখিয়েছিলেন, তাঁদের জন্য আজ বাঙালি বুক ফুলোয়।
প্রধানশিক্ষক,
ফুলমালঞ্চ ঋতুভকত উচ্চ বিদ্যালয়
