|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
এপার বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাস, বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভাষা ও দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন এবং দেশপ্রেমের ইতিহাসকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে বিভিন্ন সময়ের প্রখ্যাত লেখকেরা। তাঁদের লেখা উপন্যাস ও গল্পের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো হলো সাহিত্যরস ও জাতীয়তাবোধের এক দারুণ মিশ্রণ। সাহিত্যনির্ভর দেশাত্মবোধক ৫ টি উল্লেখযোগ্য বাংলা চলচ্চিত্রর কথা তুলে ধরেছেন শান্তনু দাস।
১) ছিন্নমূল: (১৯৫০)
এই চলচ্চিত্রটি স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য্যের ‘নোনা ছেঁড়া নোঙর’ নামক সাহিত্য বা গল্প অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল। ভারত বিভাজনের প্রেক্ষাপটে পূর্ববঙ্গের বাস্তুহারা মানুষদের দুঃখ-দুর্দশা ও শরণার্থী জীবনের বস্তুচিত্র এই সিনেমাটি ১৯৫০ সালে বিমল দে’র প্রযোজনায় ও নিমাই ঘোষের পরিচালনায় মুক্তিপ্রাপ্ত হয়। এই সিনেমাটিকে ভারতের প্রথম নব্য বাস্তববাদী চলচ্চিত্র হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অভিনয়ে ছিলেন—শোভা সেন, প্রেমাংশু বোস, চারু প্রকাশ, শান্তি মিত্র, গঙ্গাপদ বসু, বিজন ভট্টাচার্য প্রমুখ। সিনেমায় গানগুলির সুরকার ছিলেন—অনিলবরণ দাস ও নৃপেন পাল। সেইসময় বিখ্যাত রাশিয়ান চলচ্চিত্র পরিচালক পুডোভকিভ এই সিনেমাটি দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধহন যে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে চলচ্চিত্রটি রাশিয়ায় প্রদর্শনের জন্য এই ছবির প্রিন্ট নিয়েছিলেন। সেই সময়ে চলচ্চিত্রটি রাশিয়ায় ১৮১ টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয় এবং সেখানকার দর্শক-সমালোচকমণ্ডলী দ্বারা বিশেষ প্রশংসা লাভ করে।
২) আনন্দমঠঃ (১৯৫২)
সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর উপন্যাস আনন্দমঠ (১৮৮২ খ্রিঃ)-এর উপর ভিত্তি করে ১৯৫২ সালে এই বিখ্যাত হিন্দি ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিল। ১৭৭০ সালের সন্ন্যাসী বিদ্রোহ এবং সন্ন্যাসীদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ছিল এই উপন্যাসের বিষয়। এই চলচ্চিত্রের বিখ্যাত পরিচালক হেমেন মিত্রের পরিচালনায় এই চলচ্চিত্রের অংশসহ পৃথ্বী- রাজ কাপুর, প্রদীপ কুমার, গীতা বালি, ভারত ভূষণ প্রমুখদের অভিনয় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। উল্লেখ্য, হিন্দি চলচ্চিত্রে এটিই ছিল তাঁর প্রথম কাজ। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই বিখ্যাত ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি প্রথমবার জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পেয়েছিল।
৪) দেবী চৌধুরানীঃ (১৯৭৪):
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত আর একটি উপন্যাস হল দেবী চৌধুরানী। পরবর্তীতে সুবোধ চন্দ্র মিত্র এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। এই উপন্যাসের প্রধান বিষয়বস্তু হলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের নিজের থেকে শান্তির সাথে লড়াই-কাহিনী। ভারতীয়দের দেশপ্রেম, নিষ্ঠা এবং
নিঃস্বার্থতার ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের উপর নির্মিত উপন্যাসটি নিষেধ করলেও পরে তা তুলে নেওয়া হয়।
এই কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে একাধিক জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও আলোচিত চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ২০২৪ সালে। তবে, ১৯৭৪ সালে দীনেন গুপ্তের পরিচালনায় তৈরি ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম ক্লাসিক হিসাবে গণ্য হয়। দেবী চৌধুরানী চরিত্রে সুচিত্রা সেন এবং ভবানী পাঠক চরিত্রে বসন্ত চৌধুরী ছাড়াও অন্যান্য চরিত্র হিসাবে রঞ্জিত মল্লিক (সাগর চরিত্রে)-এর অভিনয়ও দর্শকের নজর কেড়েছিল।
৩) মেঘে ঢাকা তারাঃ (১৯৬০):
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শক্তিপদ রাজগুরুর বিখ্যাত উপন্যাস ‘মেঘে ঢাকা তারা’। দেশভাগের কারণে ছিন্নমূল মানুষদের যন্ত্রণা এবং উদ্বাস্তু জীবনের কঠোর বাস্তবতা এই উপন্যাসে গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। নীতা তার পরিবারের সকলের দেখাশোনা ও অভাব মেটানোর জন্য নিজের ব্যক্তিগত
সুখ, ভালোবাসার এবং উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বিসর্জন দেয়। শেষপর্যন্ত যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে তাকে অকাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়।
এই উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে ১৯৬০ সালে কালজয়ী পরিচালক ঋত্বিক ঘঠক একই নামে একটি অসামান্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। নীতা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুপ্রিয়া দেবী (সুপ্রিয়া চৌধুরী)। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন অনিল চৌধুরী (দাদা শঙ্কর), গীতা দে, বিজন ভট্টাচার্য এবং নিরঞ্জন রায়। ছবির একেবারে শেষ দৃশ্যে যক্ষ্মায় আক্রান্ত নীতার পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে
আর্তনাদ – “দাদা, আমি বাঁচতে চাই” বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ও আবেগঘন সংলাপ।
৫) সব্যসাচীঃ (১৯৭৭)
অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথের দাবী’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হওয়া ছায়াছবিটি হলো ‘সব্যসাচী’। পলাতক বাঙালি বিপ্লবী সব্যসাচীর কার্যকলাপ এবং ব্রিটিশ বিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক চরিত্র নায়ক সব্যসাচী একটি গোপন বিপ্লবী সংগঠন পথের দাবি গঠন করেন। তিনি অত্যন্ত মেধারী, উচ্চ শিক্ষিত, সাহসী এবং তার সংগঠনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৯৭৭ সালে পরিচালক পীযূষ বসু পরিচালনায় ‘সব্যসাচী’ একটি বাংলা নাট্যধর্মী এই চলচ্চিত্রটিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন উত্তম কুমার। এতে অন্যান্য চরিত্রে
অভিনয় করেন সুপ্রিয়া চৌধুরী, অনিল চ্যাটার্জি, বিকাশ রায় ও তরুণ কুমার। এই ছবির সংগীতের দায়িত্বে ছিলেন উত্তম কুমার নিজেই। ছবিটি বক্সঅফিসে দারুণ সাফল্য পেয়েছিল।
লেখক: শিক্ষক,
দেওমানপুর পাথরচওড়া উচ্চ বিদ্যালয়,
সিঙ্গুর, হুগলী ॥
তথ্যসূত্রঃ
* উল্লেখিত লেখক ও তার সাহিত্য।
* সমাজ মাধ্যম।
* পত্র-পত্রিকা।
* ইন্টারনেট মাধ্যম।
