Getting your Trinity Audio player ready...

ছোটবেলায় জলধর কুমোরের তৈরি করা মা দুর্গার ত্রিনয়ন আজও তাঁর সৃষ্টির প্রেরণা। মাত্র ৮ বছর বয়সেই তৈরি করতে পারতেন দেবীর মূর্তি। ছোট্ট সেই কিশোরটির এই শিল্পীসত্তা নষ্ট করতে পারেনি দেশভাগের যন্ত্রণা। জমিদার বাড়ির বিপুল বৈভব ছেড়ে কলকাতার ছোট পুলিস কোয়ার্টারের সীমাবদ্ধতা বাড়িয়ে দিয়েছিল তাঁর জেদ। রং-তুলির অমোঘ আকর্ষণ টেনে নিয়ে গিয়েছিল আর্ট কলেজে। ভারত বিখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরীর ছোটবেলা কিন্তু খুব একটা সোজা ছিল না। কথা বলেছেন তাপস বিশ্বাস।

> কখন সিদ্ধান্ত নিলেন, শিল্পীই হবেন?

>> মনে হয়, জন্ম থেকেই ভগবান আমায় একটা শিল্পী মন দিয়েছিলেন।
আমাদের গ্রামের আটচালাতেই পাঠশালা বসত। সবাই তখন পড়ায় মগ্ন।
আমার চোখ কিন্তু ঘুরে বেড়াত মাঠঘাট, গাছপাতা, এই সবের ওপর। বিভিন্ন রঙের ফুল আর তাদের রঙের মিশেল খুব চোখ টানতো।

> বাড়িতে শিল্পচর্চাটা কে করতেন?

>> বাবা-মা দুজনেই খুব ভাল আঁকতেন। জমিদারির কাজ পরিচালনার পাশাপাশি বাবা রোজ ছবিও আঁকতেন দলিল-দস্তাবেজের পিছনে।
এখন বুঝতে পারি বাবার একটা বড় শিল্পী মন ছিল। সম্পত্তি আর খাজনার নীরস হিসাবের মধ্যেও তিনি মগ্ন থাকতেন আপন সৃষ্টিতে।

> প্রথাগত অঙ্কনচর্চা বাড়িতে ছিল?

> তা ছিল। আমাদের ফরিদপুর জেলায় খুব যাত্রা-থিয়েটারের চল ছিল তো।
বাবা একবার এমনই এক যাত্রার পর্দার ওপর অসাধারণ সুন্দর কৃষ্ণের কালীয়দমনের দৃশ্য এঁকেছিলেন। ওটাই আমার মতে বাবার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মা-ও খুব সুন্দর আলপনা দিতেন। সুঁচ-সুতোর কাজে মায়ের আলপনা আজও চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই।

> পরিবারে আপনিই প্রথম চিত্রশিল্পকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছেন?

>> তা বলাই যায়। আসলে কলকাতায় এসে এত সমস্যায় ছিলাম আমরা যে, সবাই যার যার মতো করে বাঁচার লড়াই চালিয়েছি। ফরিপুরের জমিদারের বাড়ি কোথায়, আর কোথায় এক কামরার পুলিস কোয়ার্টার! সেটা আবার কাকার। পরিবারের সঙ্গে ছিন্নমূলের মতো কখনও ভবানীপুর, কখনও উত্তর কলকাতা, কখনও বা মফচ্ছল ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। উদ্বাস্তু জীবনটা বড় কষ্টের।

> আর পড়াশোনা?

>>প্রাথমিক শিক্ষা ফরিদপুরের ডহর পাড়া গ্রামের পাঠশালায়। কলকাতায় এসে প্রথমে হরলালকার স্কুল, পরে ঢাকুরিয়ার দ্বারকানাথ বিদ্যাপীঠে ভর্তি হই। ছাত্রজীবনে একটা মজার ঘটনা আছে। সিক্সের বদলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়েছিলাম। তখন ক্লাস সেভেনে বীজগণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, বায়োলজি এ সব পড়ানো হত। ক্লাস সিক্স না পড়ায় প্রথমে খুব অসুবিধা হলেও সব সামলে স্কুল ফাইনালে স্কুলে দ্বিতীয় হই।

> ছোটবেলা থেকেই বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন ?
>> আমি বামপন্থী ছিলাম, তা ঠিক নয়।
তবে বাড়িতে খুব বামপন্থার চর্চা হত। আমার হাতের লেখা, আঁকা ভাল ছিল বলে আমায় ওঁরা ধরতেন ওঁদের পার্টির পোস্টার লিখে দেওয়ার জন্য। খবরের কাগজের ওপর আলতা দিয়ে তা করেও দিতাম। এই করতে করতেই আমার প্রথম এগজিবিশনের সুযোগ মেলে!

কীভাবে?
>> তখন ঢাকুরিয়ার উদ্বাস্তু কলোনিতে থাকি। ছ’সাত জনের সংসারে দাদা একমাত্র রোজগেরে। এতই ধারে নিমজ্জিত, পাড়ার মুদিওয়ালাকে দেখলেই রাস্তা বদলাতে হত। উদ্বাস্তু কলোনি হলেও ওখানে ওপার বাংলার সর্বহারারা সংস্কৃতি বোধটাকে মরতে দেয়নি। এমনই এক রবীন্দ্রজয়ন্তীতে রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকলাম। প্রদর্শনীটা খুব প্রশংসা পেল। তার আগে কাকার ফ্ল্যাটের দেওয়ালে পেন্সিল দিয়ে ময়ূর এঁকেছিলাম। ওটাই প্রথম আঁকা।

> তখনই কি আর্ট কলেজে ভর্তির চিন্তা?
>>  বলতে পারো। আর্ট কলেজের প্রথম দিনটা জীবনে ভুলব না। এত সুন্দর জায়গাটা দেখে মনে হয়েছিল স্বর্গের দরজায় দাঁড়িয়ে আছি।

> ঢাকুরিয়ার সেই গলিঘুপচির বস্তি থেকে আজ শহরের সবচেয়ে ‘উঁচুতলা’র বাসিন্দা! এই দূরত্ব কতটা?
>> প্রতিকূলতাই দূরত্ব! আর্ট কলেজে পড়ার সময়েও ক্যানভাস কেনার সামর্থ ছিল না। তবুও এমন একজন ছিলাম, যে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। পেটে খাওয়ার ভাত জোটে না ঠিকমতো অথচ মাথায় রং-তুলির নেশা। তবে আমি খুব পারফেকশনিস্ট। যখনই যা করেছি খুব মন দিয়ে করেছি।
এমনও হয়েছে একটা ছবি আঁকতে আমার বহু সময় লেগেছে। আবার কোনওটা এক সপ্তাহেই শেষ করে ফেলেছি। এখন মাঝে মাঝে সাদা ক্যানভাসের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। সেই সবুজে ভরা গ্রাম, জল টলটল নদী, টু পটাপ বৃষ্টির শব্দ, পদ্মদিঘি, সব কিছু আজও আমার চেতনাকে নাড়া দেয় বিপুলভাবে। মনে কবিতা জাগে- প্রাণ ছিল অফুরন্ত আনন্দভরা সঙ্গে ছিল বুক ভরা ইচ্ছা আর মুখ ভরা দুরন্ত হাসি। এই ইচ্ছা আর হাসিটাই আমার জীবনের রহস্য।