Getting your Trinity Audio player ready...

বাংলায় জমিদারতন্ত্রের বার-বাড়ন্ত মুঘল আমলে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিশের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’র মাধ্যমে সেই জমিদারি পেলো এক নতুন রূপ। সেসময়ের জমিদার মানে কেবল রাজস্ব আর খাজনা আদায়ের যন্ত্র ছিলোনা, রেখে গিয়েছিলো শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজসেবা ও জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বাংলার ইতিহাসে এমনই সাতটি ঐতিহ্যবাহী জমিদার বংশের কথা লিখেছেন
গার্গী মুখার্জী।

১. লালগোলা জমিদারবাড়ি:

মুর্শিদাবাদের লালগোলা জমিদার বংশ বাংলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবার। অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে উত্তরপ্রদেশের গাজীপুর থেকে আসা রায়(রাই) পরিবার ব্যবসার সূত্রে লালগোলায় এসে বসতি গড়ে তোলার পরে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে শক্তিশালী জমিদারি গড়ে তোলেন। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর তাঁদের জমিদারি আরও বিস্তৃত হয়। রাও রামশঙ্কর রায়কে এই বংশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। পরিবারের অন্যতম কৃতি ব্যক্তিত্ব মহারাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়ের উদ্যোগে ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এলাকার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান – লালগোলা মহেশ নারায়ণ একাডেমি। প্রজাদের জন্য সুপেয় পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে তিনি বহু কুয়ো খনন করান এবং ‘জলপেরে’ উপাধিতে সম্মানিত হন। ১৮১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী লালগোলা রাজ কালীবাড়ির সঙ্গে নিবিড় যোগ ছিলো বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও কাজী নজরুল ইসলামের। স্বাধীনতার পর রাজা বীরেন্দ্র নারায়ণ রায় রাজপ্রাসাদ ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ জমি সরকারকে দান করেন। সেই স্থানেই ১৯৮৭ সালে ভারতের প্রথম মুক্ত সংশোধনাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। সমাজসেবা, শিক্ষা ও জনকল্যাণে এই জমিদার বংশের অবদান আজও স্মরণীয়।

২. জোড়াসাঁকো ঠাকুরপরিবার:

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ছিলো স্বাধীনতাপূর্ব বাংলার নবজাগরণ, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। এই পরিবারের আদিপুরুষ ছিলেন দীন কুশারী। পরবর্তীকালে পঞ্চানন কুশারী ‘ঠাকুর’ উপাধি লাভ করেন। ১৭৮৪ সালে নীলমণি ঠাকুর জোড়াসাঁকোতে ঠাকুরবাড়ি নির্মাণ করেন। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোগী ও সমাজসংস্কারক। তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে ধর্ম ও সমাজসংস্কারে অবদান রাখেন। এই পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া স্বর্ণকুমারী দেবী, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর মতো অনন্য প্রতিভারা বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে দেশের র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।

৩. নদীয়া রাজপরিবার:

নদিয়ার রাজপরিবার বাংলার প্রাচীনতম ও সাংস্কৃতিকভাবে অন্যতম প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার বংশ। প্রায় পঁয়ত্রিশ প্রজন্ম ধরে এই পরিবার বাংলার সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ভবানন্দ মজুমদারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি মুঘল সেনাপতি মানসিংহকে প্রতাপাদিত্য দমনে সহায়তা করে নদিয়া রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন। তাঁর কৃতিত্বের উল্লেখ ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গল কাব্যেও পাওয়া যায়। এই রাজবংশের সর্বাধিক খ্যাতিমান শাসক ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। তিনি পাণ্ডিত্য, সংস্কৃতিচর্চা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর উদ্যোগে নদিয়ায় ‘জগদ্ধাত্রী পূজা’ ও ‘বারোদোল’ উৎসবের প্রচলন হয়। তাঁর রাজসভায় প্রখ্যাত রসিক গোপাল ভাঁড়সহ বহু পণ্ডিত, কবি ও শিল্পী সমাদৃত ছিলেন। যদিও তিনি পলাশীর যুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের সমর্থন করেছিলেন, তবু শিক্ষা, সাহিত্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের বিকাশে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

৪. বর্ধমান জমিদারবাড়ি:

বর্ধমান রাজপরিবার ছিল বাংলার বৃহত্তম, সমৃদ্ধতম এবং প্রভাবশালী জমিদার বংশগুলির অন্যতম। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পাঞ্জাব থেকে আগত কাপুর বংশের সঙ্গম রায়। তাঁর উত্তরসূরি কৃষ্ণরাম রায় মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে স্বাধীন জমিদার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। পরবর্তীকালে বর্ধমান রাজপরিবার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করে। মহারাজাধিরাজ মহতাব চাঁদ জমিদারির আর্থিক স্থিতি বজায় রাখতে ‘পত্তনি ব্যবস্থা’ চালু করেন, যা বাংলার ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বংশের পৃষ্ঠপোষকতায় কালনার বিখ্যাত ১০৮ শিবমন্দির নির্মিত হয়, যা আজও বাংলার ঐতিহাসিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। মহারাজা বিজয় চাঁদ মহতাব শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর ১৯৫৫ সালে মহারাজা উদয় চাঁদ মহতাব বর্তমান রাজপ্রাসাদ পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে দান করেন। বর্তমানে সেই ঐতিহাসিক প্রাসাদেই বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যা এই রাজপরিবারের শিক্ষানুরাগের স্থায়ী স্মারক।

৫. ইটাচুনা জমিদারবাড়ি:

ছোটবেলায় মা ঠাকুমার মুখে শোনা ঘুমাপাড়ারনি ছড়া,“খোকা ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো, বর্গী এলো দেশে”,বাংলায় মারাঠা বর্গীদের আক্রমণের স্মৃতি বহন করে। অষ্টাদশ শতকে ‘চৌথ’ বা কর আদায়ের জন্য তারা বারবার বাংলায় হানা দেয়। এরকমই কয়েকটি বর্গী পরিবার এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলো কুন্দন বা কুন্দ্র পরিবার। অষ্টাদশ শতকে বাংলায় মারাঠা আক্রমণের সময় হুগলি জেলার ইটাচুনা অঞ্চলে বসতি স্থাপন করার পর কুন্দন পরিবার যুদ্ধ ছেড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জমিদারি পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তকালে এনারা ‘কুন্ডু’ পদবী গ্রহণ করেন। তাঁদের উদ্যোগে ১৭৬৬ সালে শুধুমাত্র ইট ও চুন সুরকি দিয়ে নির্মিত হয় ঐতিহাসিক ইটাচুনা রাজবাড়ি। নির্মাণসামগ্রীর নাম থেকেই ইটাচুনা নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। স্থানটির পরিচিত হয় ‘বর্গীডাঙা’ নামে। বিশাল ঠাকুরদালান, খিলানযুক্ত বারান্দা, লম্বা করিডর, প্রাচীন আসবাব, অন্দরমহল ও অলংকৃত প্রবেশদ্বার আজও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয়। বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় হেরিটেজ হোমস্টে। ইটাচুনা জমিদারবংশের বিশেষত্ব হলো যে তাদের শিকড় মারাঠা বর্গীদের সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও তারা পরে বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

৬. সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার:

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জমিদার বংশ। এই পরিবারের শাখা কলকাতা, বড়িশা ও হালিসহরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত। মুঘল আমলে তাঁরা সুতানুটি, কলিকাতা ও গোবিন্দপুর, এই তিন গ্রামের জমিদার ছিলেন। ১৬৯৮ সালের ১০ নভেম্বর মুঘল রাজপুত্র আজিম-উশ-শানের অনুমতিক্রমে পরিবারটি মাত্র ১,৩০০ টাকার বিনিময়ে এই তিন গ্রামের জমিদারি স্বত্ব ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে লিজ দেয়। এই ঘটনাকেই আধুনিক কলকাতা নগরীর বিকাশের অন্যতম সূচনা হিসেবে ধরা হয়। ১৬১০ সালে বড়িশার সাবর্ণ রাজবাড়ীতে কলকাতার প্রথম পারিবারিক দুর্গাপূজার সূচনা হয়, যা আজও ঐতিহ্যের সঙ্গে পালিত হয়। পরিবারের কুলদেবী শ্যামরায় ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক মন্দিরও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বড়িশার ‘বড় বাড়ি’-তে অবস্থিত সাবর্ণ সংগ্রহশালায় প্রাচীন দলিল, মুদ্রা, মানচিত্র, পাণ্ডুলিপি, অস্ত্রশস্ত্র এবং কবি রামপ্রসাদ সেনের স্বাক্ষরিত নথি সংরক্ষিত রয়েছে। কলকাতার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের অবদান আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

৭. মহিষাদল রাজবাড়ি:

পূর্ব মেদিনীপুরের রূপনারায়ণ নদীর তীরে অবস্থিত মহিষাদল রাজবাড়ি বাংলার দ্বিতীয় প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী রাজবংশের স্মারক। ষোড়শ শতকে মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনকালে জনার্দন উপাধ্যায় এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকায় ১৮০৪ সালে গর্গ পরিবার রাজত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং রাজা গুরুপ্রসাদ গর্গ প্রথম শাসক হিসেবে অভিষিক্ত হন। বর্গী আক্রমণের সময় মহিষাদলের রাজারা পর্তুগিজ গোলন্দাজদের আশ্রয় দিয়ে রাজ্যরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রানী ভবানীর উদ্যোগে বর্তমান রাজপ্রাসাদ নির্মিত হয়, যা ইউরোপীয় ও ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর অনন্য সংমিশ্রণ। ১৭৭৬ সালে এখানকার বিখ্যাত রথযাত্রার সূচনা হয়, যা আজও বিপুল উৎসাহে পালিত হয়। রাজপরিবার শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও বিশেষ অবদান রেখেছিলো। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর রাজপ্রাসাদটি সরকার অধিগ্রহণ করে। বর্তমানে এটি একটি ঐতিহাসিক জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত, যেখানে রাজপরিবারের ব্যবহৃত আসবাবপত্র, অস্ত্র, শিল্পকর্ম ও মূল্যবান নিদর্শন হিসেবে রয়ে গেছে।

সার্বিকভাবে বলা যায় যে বাংলার এই সাত জমিদারবংশের বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, সমাজসেবা ও নগরায়ণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ১৯৫০ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইন বলে পশ্চিমবঙ্গে জমিদারি প্রথার অবসান হলেও তাঁদের নির্মিত প্রাসাদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজও বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাসের অমূল্য স্মারক হয়ে আছে।

লেখক: প্রধানশিক্ষিকা,
বালিয়া নফরচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়,
গড়িয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনা