|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
বাংলার মাটি শুধু নদী, পলি আর শস্যের জন্ম দেয় না। জন্ম দেয় উৎসবেরও। ঋতুচক্রের পরিবর্তন, কৃষকের ঘামে ভেজা ফসলের ক্ষেত, লোকবিশ্বাসের গভীর শিকড় এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রবাহ মিলেমিশে পশ্চিমবঙ্গকে গড়ে তুলেছে এক অনন্য উৎসবভূমি। বাংলার লোকমুখে, ‘বারো মাসে তেরো পর্বন’। এপার বাংলার সাতটি পরব নিয়ে তথ্যমালা গেঁথেছেন প্রশান্ত পুরকাইত
‘পরব’ কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রা, ইতিহাস, সমাজচেতনা এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত প্রকাশ। ‘পরব’ শব্দটি বাংলা লোকসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। শব্দটির উৎস নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ থাকলেও এটি সংস্কৃত ‘পর্ব (Parva) শব্দ থেকে উদ্ভূত। সংস্কৃত ‘পর্ব শব্দের অর্থ হলো বিশেষ তিথি, উৎসব, সন্ধিক্ষণ বা গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষার বিবর্তনের ধারায় ‘পর্ব শব্দটি বাংলায় ‘পরব রূপ লাভ করে।
পশ্চিমবঙ্গের জেলা-ভিত্তিক কয়েকটি জনপ্রিয় লোকপরব, যেগুলির ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক গুরুত্ব না জানলেই নয়।
(১) টুসু:
পুরুলিয়া জেলার স্থানীয় এলাকা বাঘমুণ্ডি, বলরামপুর, মানবাজার, কাশীপুরের বিভিন্ন গ্রামে প্রচলিত পরব হলো ‘টুসু’। প্রাচীন বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে ‘টুসু পরব’ মূলত নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দ। সারা শীতে পৌষ মাস জুড়ে টুসুগান পরবের থিমসং। এবং সংক্রান্তির দিনে পরবের র সমাপ্তি।বাংলার মা-বোনেদের অংশগ্রহণ এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। টুসুগানের মাধ্যমে গ্রামীণ ভৌগোলিক ও সামাজিক সমস্যা, প্রেম, প্রকৃতি ও কৃষিজীবনের চিত্র কোলাজ হয়ে ফুটে ওঠে এই গানের কথায়।গ্রাম্য সমাজের সাংস্কৃতিক ঐক্য ও কৃষিভিত্তিক লোকসাহিত্যের পারস্পরিক হাতধরাধরি ছবি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে যুগযুগান্ত ধরে। কৃষিজীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নারীকেন্দ্রিক লোক-ঐতিহ্য আগলে রাখার সামাজিক দলিল ‘টুসু পরব’।
(২) ‘করম’:
পুরুলিয়া জেলার বান্দোয়ান, বরাবাজার, বাঘমুণ্ডি এলাকার আরেক জনপ্রিয় উৎসব হলো ‘করম পরব’।
প্রাচীন আদিবাসী সমাজের করম দেবতার পুজোকে কেন্দ্র করে এই ঐতিয্যের উৎসব। স্থানীয় করম গাছের ডাল এনে পুজোর প্রথার প্রধান অংশ হলো সারারাতধরে যুবক-যুবতীদের সঙ্গবদ্ধ গান ও নাচ। কৃষিজ উৎপাদন ও সামাজিক সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা হয় ঝুমুরগান ও আদিবাসী লোকনৃত্যের মাধ্যমে। আদিবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক গুরুত্ব, ভ্রাতৃত্ববোধ, সহযোগিতা এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠার উৎসব হলো ‘করম পরব’।
(৩) ‘ভাদু’:
বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী, কোতুলপুর, ইন্দাস, বিষ্ণুপুর মহকুমার গ্রামাঞ্চলে মূলত ভাদু পরবের প্রভাব।
আনুমানিক ১৭শ–১৮শ শতক থেকে রাঢ়বাংলার লোকঐতিহ্যের অংশ ও অন্যতম সামাজিক পরিচয় এই ভাদু পরব। মূলত সারা ভাদ্র মাসজুড়ে চলা এই নারীকেন্দ্রিক লোকউৎসব হলো রাঢ়বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী। লোককাহিনি অনুসারে ভাদু ছিলেন এক রাজকন্যা, যাঁর স্মৃতিকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের প্রচলন ঘটে।গ্রামীণ কিশোরী, তরুণী থেকে যুবতী ও বৃদ্ধা মহিলারা ভাদু দেবীর প্রতীকী প্রতিমা স্থাপন করে প্রতিদিন ভাদুগান গেয়ে থাকেন। ভাদুগানের প্রতিটি লাইনে থাকে প্রেম, প্রকৃতি, সমাজজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং গ্রামীণ জীবনের নানা অনুভূতির প্রকাশ।বাংলার এই উৎসবটি মৌখিক লোকসাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হিসেবে আজও রয়ে গেছে। ভাদ্র সংক্রান্তিতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে উৎসবের শেষ হয়। ভাদু পরব গ্রামীণ
নারীদের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতি, লোকসাহিত্য ও লোকসংগীত সংরক্ষণে ভাদু পরবের সামাজিক গুরুত্ব ও ভূমিকা অপরিসীম।
(৪) ‘গম্ভীরা’:
মালদা জেলার স্থানীয় ইংরেজবাজার, হবিবপুর, মানিকচক এলাকা হলো গম্ভীরা উৎসবের কেন্দ্রস্থল এবং সর্বাধিক পরিচিত লোকউৎসব। শিবপুজোর সঙ্গে গম্ভীরা’র ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। মুখোশ ও সামাজিক নাট্যরূপ এই পরবের প্রধান বৈশিষ্ট্য। লোকনাট্য ও লোকসাহিত্যের মাধ্যমে উৎসব কীভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে কাজ করে তার প্রত্যক্ষ দলিল গম্ভীরা পরব।
(৫) ‘তিস্তা বুড়ি’:
জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি, ধূপগুড়ি, জলপাইগুড়ি সদর ও তিস্তা নদী সংলগ্ন অঞ্চলের আদি পরব এই তিস্তা বুড়ির পুজো। মধ্যযুগের (আনুমানিক ১০ম- ১৫শ শতক) অতি প্রাচীন লোকউৎসব এটি। ইতিহাস বলে, তিস্তা নদীকে দেবীরূপে কল্পনা করে এই পূজার প্রচলন হয়েছে। নদীর ভাঙন, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার জন্য স্থানীয় কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের মানুষজন নদী তিস্তাকে মাতৃজ্ঞানে আরাধনা শুরু করে। সেইজন্যই পালন করা হয় নদীকেন্দ্রিক লোকগান ও আচার-অনুষ্ঠান। পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রতিফলন এই উৎসবে দেখা যায়। বাংলার নদীভিত্তিক লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দলিল হলো তিস্তা বুড়ির বন্দনা বৃতান্ত। প্রকৃতি সংরক্ষণ ও নদীভাঙ্গন এবং নদী নির্ভর জীবনব্যবস্থার গল্প শোনায় তিস্তা বুড়ি।
(৬) লোসার:
দার্জিলিং জেলার শহর দার্জিলিং, ঘুম, কালিম্পং, মিরিক অঞ্চলের অতিজনপ্রিয় উৎসব হলো লোসার।
প্রাচীন তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহ্য মেনে তিব্বতি নববর্ষ উৎসব হিসেবে পালিত হয় লোসার।বৌদ্ধ মঠে বিশেষ প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী তিব্বতী ঘরানার পোশাক, উৎসবের আহার আয়োজন ও নাচ-গান। পারিবারিক ও সামাজিক পুনর্মিলনের উৎসব হিসেবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে পর্যটকদের কাছে লোসার একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। বৈচিত্রময় বাংলায় হিন্দু-মুসলিম পরবগুলির পাশাপাশি বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্য সংরক্ষণে উত্তরবাংলার এই পাহাড়ি উৎসব মহাগুরুত্বপূর্ণ।
(৭) ‘বনবিবি’:
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার গোসাবা, কুলতলি, বাসন্তী, পাথরপ্রতিমা, সুন্দরবন অঞ্চলজুড়ে ‘বনবিবি’র প্রভাব। ইতিহাস বলে, ১৬শ–১৭শ শতকে সুন্দরবনের বনজীবী মানুষের রক্ষাকর্ত্রী দেবী হিসেবে বনবিবি পুজো শুরু হয়েছিল। বন্যা, নদী ভাঙ্গন, পশু আক্রমণ ও জীবন ও জীবিকার সুরক্ষায় সেদিন হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এই আরাধনা শুরু হয়েছিল। আজও জাতি-ধর্ম ভেদে অংশগ্রহণ এই উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বনবিবির পালাগান ও লোকনাট্য বনবিবি পুজোর অংশ। মৌয়াল, জেলে ও বনজীবীরা বনপ্রবেশের আগে দেবীকে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীবিকার সঙ্গে লোকবিশ্বাস, পরিবেশচেতনা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নদীজলকে সাগরে মিশিয়েছে এই উৎসব।
লেখক: সহশিক্ষক, কৃষ্ণপুর হাই স্কুল (উ:মা:)
নির্বাচিত গ্রন্থঋণ ও তথ্যসূত্র
১. আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলার লোকসাহিত্য।
২. দুলাল চৌধুরী (সম্পা.), বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ।
৩. বিনয় ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি।
৪. অতুল সুর, বাংলার সামাজিক ইতিহাস।
৫. পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতি।
৬. তুষার চট্টোপাধ্যায়, বাংলার লোকউৎসব ও মেলা।
৭. Anthropological Survey of India, People of India: West Bengal।
