|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
বাংলা নাটকের ধারা শুরু মোটামুটি অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে। ১৭৯৫ সালে এক রুশ নাট্যপ্রেমী গেরাসেন লেবেদেফ কলকাতার ডোমতলায় বাংলা ভাষায় অনূদিত নাটক মঞ্চস্থ করেন। এখান থেকেই বাংলা আধুনিক নাটকের সূত্রপাত। এরপর এক প্রখ্যাত নাট্যকার প্রসন্নকুমার ঠাকুর কলকাতার হিন্দু থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন।১৮৫৪ সালে রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘কুলীনসর্বস্ব’ নাটকটির পরে যে সমস্ত জনপ্রিয় নাট্যকার ও নাটক বাঙালির সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন, নাট্যজগতের সেরকম সাত চরিত্র নিয়ে প্রতিবেদন স্বাতী সান্যালের।
১. মাইকেল মধুসূদন দত্ত: (১৮২৪-১৮৭৩)
আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে মাইকেল মধুসূদন দত্ত নামে এক অসাধারণ প্রতিভার জন্ম
হয়েছিল বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে। ছেলেবেলার এই অত্যন্ত মেধাবী ছেলেটি পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। তিনি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করেন তিনি শুধু কবি ছিলেন না, নাট্যকার ও ছিলেন। তাঁর লেখায় মিশে আছে বীরত্ব, কল্পনা, মানবিকতা ও নাটকীয়তার সম্পূর্ণ সমন্বয়। বাংলা কাব্যে তিনি প্রথম সফলভাবে ‘অমিত্রাক্ষর’ ছন্দ ব্যবহার করেন। তাঁর প্রথম সফল ‘অমিত্রাক্ষর’ ছন্দের কাব্য ‘তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য’। এবং সবচেয়ে বিখ্যাত অমিত্রাক্ষর ছন্দের সাহিত্যসৃষ্টি হলো ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। এছাড়া ‘ব্রজাঙ্গনা’ এবং বীরাঙ্গনা একই ছন্দে রচিত। নাটক ছাড়াও কবি মধুসূদনের হাতের ছোঁয়ায় যে সমস্ত মনে রাখার মতো বিভিন্ন ধরণের নাটক সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো হলো:
১) শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯, পৌরাণিক ট্রাজেডি নাটক)
২) একেই কি বলে সভ্যতা (১৮৬০, প্রহসনমূলক নাটক)
৩) বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০, প্রহসনমূলক নাটক)
৪) পদ্মাবতী (১৮৬০, পৌরাণিক রোমান্টিক নাটক)
৫) কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১ ,ঐতিহাসিক ট্রাজেডি)
এই নাটকগুলি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।
২. দীনবন্ধু মিত্র: (১৮৩০-১৮৭৩)
মধুসূদন দত্তের সমসাময়িক ছিলেন। দীনবন্ধু মিত্র ।
বাংলার চৌবেড়িয়া নামক সাধারণ গ্রামে তার জন্ম। ডাক বিভাগের চাকরি করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। আর সেই ছবি ফুটে উঠেছে তাঁর লেখা নাটকের মধ্যে। সেই সময় নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে বাংলা কৃষকরা যেভাবে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হতো, সেই প্রেক্ষাপটেই সামাজিক অত্যাচার ও বিচারের বাস্তব চিত্র তিনি তাঁর কলমের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছিলেন বিখ্যাত ‘নীলদর্পণ’ নাটকে। এটি প্রকাশিত হয় ১৮৬০ সালে। এই নাটকে দেখানো হয়েছে কীভাবে নীলকর সাহেবরা কৃষকদের দিয়ে জোর করে নীল চাষ করাতো। অত্যাচার করত এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিলো। এই নাটক নীল বিদ্রোহের ঘটনাকে মানুষের সামনে তুলে ধরে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।পরে অবশ্য নাটকটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে ভারত ও ইউরোপেও আলোড়ন তোলে।
৩. নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ: (১৮৪৪-১৯১২ )
সমসাময়িক দুই প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব নাট্যকার ছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দুজনেই বাংলার নাট্য-সাহিত্যের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। যখন গিরিশচন্দ্র ঘোষ বয়সে সতেরো তখন রবীন্দ্রনাথের জন্ম। বাংলার নাট্য জগতে গিরিশচন্দ্র ঘোষ এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি নাটক লিখতেন, একইসঙ্গে নাটক পরিচালনাও করতেন। আবার অভিনয়ও করতেন। বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী তাঁর লেখা নাটক গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো –
পৌরাণিক: ১)অভিমন্যু বধ (১৮৮১) ২) সীতার বনবাস (১৮৮১)
৩) সীতা হরণ ( ১৮৮২) ৪) পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস (১৮৮২)
খ) ভক্তিমূলক নাটক: ১) চৈতন্য লীলা (১৮৮৪) ২) শঙ্করাচার্য(১৯১০)
গ) সামাজিক নাটক:
১) প্রফুল্ল (১৮৮৯)
২) বলিদান (১৯০৪)
ঘ) ঐতিহাসিক নাটক
১) সিরাজৌদ্দোলা(১৯০৫)
২) মীরকাশীম(১৯০৬)
৩) ছত্রপতি শিবাজী (১৯০৭)
৪) কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১- ১৯৪১)
তিনি কবি। গীতিকার। সুরকার। ঔপন্যাসিক। চিত্রশিল্পী। একইসঙ্গে নাট্যকার ও বটে। তিনি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সৃষ্ট বাংলা নাটক মানে ও মর্যাদায় বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা পায়। রবি ঠাকুরের বিখ্যাত যে সমস্ত নাটকগুলি বাংলা সাহিত্যের অনন্য সৃষ্টি, সেগুলি হলো :
১) বাল্মিকী প্রতিভা (১৮৮১)
২) কালমৃগয়া (১৮৮২)
৩) মায়ার খেলা (১৮৮৮)
৪) রাজা ও রানী (১৮৮৯)
৫) বিসর্জন (১৮৯২)
৬) ডাকঘর (১৯১২)
৭) অচলায়তন (১৯১২)
৮) ফাল্গুনী (১৯১৬)
৯) মুক্তধারা (১৯২২)
১০) রক্তকরবী( ১৯২৪)
এই নাটকগুলির মধ্যে আবার অমোঘ সৃষ্টি হলো ‘রক্তকরবী’।এই নাটকে মানবতাবাদ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও সমাজ চেতনার মধ্যদিয়ে কবিগুরুর নাটকের কাব্যিক সৌন্দর্য ও গভীর জীবনবোধ ও দর্শনের সমন্বয় দেখতে পাওয়া যায়।
৫. দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩)
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। বাংলা সাহিত্যে নাটকের ধারা অনুযায়ী তাঁর লেখা বিখ্যাত ও বাছাইকরা সাহিত্য-সৃষ্টিগুলি হলো:
ক) ঐতিহাসিক নাটক
১) তারাবাঈ ( ১৯০৩)
২) রানা প্রতাপ সিংহ (১৯০৫)
৩) মেবার পতন (১৯০৮)
৪) নূরজাহান (১৯০৮)
৫) শাহজাহান (১৯০৯)
৬) চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১)
জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে যেসমস্ত নাটকগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল:
খ) পৌরাণিক নাটক
১) পাষাণী ( ১৯০০)
২) সীতা (১৯০৮)
গ) সামাজিক নাটক
১) পরপারে (১৯১২)
২) বঙ্গনারী (১৯১৬) ইত্যাদি।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সমসাময়িক ছিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ, বিদ্যাবিনোদ, শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তদের মতো নাট্যব্যক্তিত্ব। এঁদের নাটক রচয়িতা ও নাট্যকারদের বিস্মৃতির আড়ালে ফেলে দিলে চলবেনা।
৬. বিজন ভট্টাচার্য: (১৯১৫ – ১৯৭৮)
স্বাধীনতার পরে বাংলা নাটকের নতুন ধারা সৃষ্টি হয় বিজন ভট্টাচার্যের হাতধরে। তাঁর সামাজিক নাটক ‘নবান্ন’ (১৯৪৪) দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
৭. উৎপল দত্ত: (১৯২৯ – ১৯৯৩)
স্বাধীনতার পরে বাংলা নাটকের নতুন ধারার সৃষ্টি হয় উৎপল দত্ত এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি রাজনৈতিক এবং গণমুখী নাটকের মাধ্যমে বাংলা নাট্য জগতে বিশেষ স্থান অধিকার করেন।
বাংলার নাটক আমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে আবহমানকাল। লোকনাট্য থেকে আধুনিক নাটক পর্যন্ত দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বাংলা নাটক আজ সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী শিল্প মাধ্যমে পরিণত হয়েছে এইসব কৃতি মানুষদের হাতধরে।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষিকা,
ভট্টনগর কুলকামিনী বালিকা বিদ্যালয়,
লিলুয়া, হাওড়া
