|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
সামাজিক, আর্থিক পরিসরে সে সময়ে মেয়েরা ছিল পুরোপুরি পর্দার আড়ালে। তাঁদের জীবন ছিল চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে আবদ্ধ। অন্ধকার থেকে আলোয় আসতে পথ দেখিয়েছিলেন যে সব মহীয়সী নারীরা, যাঁদের কথা না জানলে অপূর্ণ থেকে যাবে ইতিহাস-জ্ঞান, এরকমই সাত মনীষার কথা স্মরণ করেছেন স্বাতী কর্মকার
১. বীণা দাস (২৪ আগস্ট ১৯১১ – ২৬ ডিসেম্বর ১৯৮৬):
কলকাতার সেন্ট জন্স ডায়োসেসান গার্লস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল এবং পরবর্তীতে কলকাতার বিখ্যাত বেথুন কলেজ থেকে পড়াশোনা করে সুভাষ চন্দ্র বোসের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বীনা দাস যুগান্তর দলে নাম লেখান। ভারত মাতার স্বাধীনতা ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাঁর বাবা বেণীমাধব দাস ছিলেন সুভাষচন্দ্র বোসের শিক্ষক। ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালানোর শাস্তি হিসেবে তাঁকে নয় বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।
২. কমলা দাশগুপ্ত (১১ মার্চ ১৯০৭ – ১৯ জুলাই ২০০০ ):
স্বাধীনতা সংগ্রামে এমন অনেকে আছেন, যাঁদের গোপনে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন বাংলার মেয়েরা। কমলা দাসগুপ্ত এমনই আরেক নাম। স্কুলবেলায় তিনি ছিলেন মেধাবী। পড়তেন বেথুন কলেজে। সেখান থেকে ১৯২৮ সালে বি.এ এবং পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ‘যুগান্তর’ ও অন্যান্য বিপ্লবী দলের সাথে যুক্ত থেকে বিপ্লবীদের গোপনে অস্ত্র ও বোমা সরবরাহ করতেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়।১৯৩২ সাল, তৎকালীন বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে গুলি করার জন্য বিপ্লবী বীণা দাসকে রিভলবারটি কমলা দাশগুপ্তই ব্যবস্থা করেছিলেন।
৩. দুকড়িবালা দেবী: (২১ জুলাই, ১৮৮৭ ― ২৮ এপ্রিল, ১৯৭১)
বীরভূম জেলার নলহাটি থানার ঝাউপাড়া গ্রামে দুকড়িবালা দেবীর জন্ম।ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম মহিলা রাজবন্দী ছিলেন দুকড়িবালা দেবী। তিনি বিপ্লবী দলগুলির জন্য অস্ত্র লুকিয়ে রাখা ও বিতরণের দায়িত্ব পালন করতেন।
৪. ননীবালা দেবী: (১৮৮৮ ― ১৯৬৭)
হাওড়ার বালি এলাকার সূর্যকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ও গিরিবালা দেবীর মেয়ে হলেন ননীবালা দেবী। ১৯১৫ সালে রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী সেজে প্রেসিডেন্সি জেলে গিয়ে মসার পিস্তলের গুপ্ত খবর নিয়ে আসেন। পুলিশ জানতে পারার পর তাকে গ্রেপ্তার করে।তিনি প্রথম মহিলাবাঙালী বিপ্লবী ও প্রথম মহিলা রাজবন্দী।
৫. লেডি অবলা বসু: (৮ আগস্ট, ১৮৬৫ – ২৬ এপ্রিল, ১৯৫১)
অবলা বসু ছিলেন একজন অবিসংবাদিত ভারতীয় সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ এবং নারীবাদী কর্মী। ১৯১৬ সালে তাঁর বিজ্ঞানী স্বামী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ‘নাইট’ উপাধিতে পাওয়ার পর তাঁর নামের আগে ‘লেডি’ উপাধি ব্যবহার শুরু হলো। কেবল স্বামীর পরিচয়ে নয়, তৎকালীন বাংলায় নারী শিক্ষার প্রসার ও নারীদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তাঁর বাবা, দুর্গামোহন দাস ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্রাহ্ম সমাজ সংস্কারক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী ছাত্রীদের একজন ছিলেন এই অবলা বসু। পরবর্তীকালে তিনি মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে (বর্তমানে চেন্নাই) চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে যান। চার বছর সফলভাবে পড়াশোনার পর ১৮৮৬ সালে সার্টিফিকেট কোর্স পাস করেন। তিনি চাইলেই প্রথম বাঙালি নারী চিকিৎসক হতে পারতেন। কিন্তু নানা সামাজিক কারণে চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর ডিগ্রি কোর্স শেষ করা সম্ভব হয়নি। ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভারতে প্রথম মারিয়া মন্টেসরি শিক্ষাদানের আধুনিক পদ্ধতি চালু করেন।
৬. কাদম্বিনী বসু গাঙ্গুলী: (১৮ জুলাই ১৮৬১ – ৩ অক্টোবর ১৯২৩)
কাদম্বিনী বসু গাঙ্গুলী ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন ইউরোপীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী চিকিৎসক। সেসময়ের রক্ষণশীল সমাজের সমস্ত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে তিনি চিকিৎসাক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন ব্রজকিশোর বসু। ব্রজকিশোর ছিলেন একজন সমাজসংস্কারক এবং ভাগলপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বাবা হিসেবে ব্রজকিশোর প্রথম কাদম্বিনীর মনে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিলেন।কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর আরেক পরিচয় হলো, তিনি বিখ্যাত ব্রাহ্ম সমাজসংস্কারক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর স্ত্রী।দ্বারকানাথ নারী শিক্ষার প্রসারে কাদম্বিনীকে আজীবন আপ্রাণ সমর্থন জুগিয়েছেন। ১৮৭৮ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিক) পরীক্ষা পাস করা প্রথম ছাত্রী হন। ১৮৮২ সালে বেথুন কলেজ থেকে চন্দ্রমুখী বসুর সাথে যৌথভাবে ভারতের প্রথম নারী স্নাতক (BA) ডিগ্রি অর্জন করেন।১৮৮৩ সালে সমস্ত সামাজিক বাধা ভেঙে তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হন।তৎকালীন বৈষম্যের কারণে ফাইনাল পরীক্ষায় তাঁকে এক নম্বরের জন্য ফেল করানো হলেও তিনি থেমে থাকেননি। ১৮৯২ সালে তিনি বিলেতে যান। সেখানে LRCP (এডিনবরা), LRCS (গ্লাসগো) ও LFPS (ডাবলিন) উপাধি নিয়ে দেশে ফেরেন।আনন্দীবাঈ জোশী তাঁর সমসাময়িক ডিগ্রি লাভ করলেও খুব অল্প বয়সে আনন্দীবাইয়ের অকালমৃত্যু হয়। ফলে কাদম্বিনী গাঙ্গুলীই ছিলেন ভারতের প্রথম সক্রিয় নারী চিকিৎসক।
৭. উজ্জ্বলা মজুমদার (২১ নভেম্বর, ১৯১৪ ― ২৫ এপ্রিল, ১৯৯২)
উজ্জ্বলা মজুমদার ছিলেন ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম বাঙালি সশস্ত্র নারী বিপ্লবী এবং সমাজকর্মী।তিনি বিখ্যাত বিপ্লবী দল ‘অনুশীলন সমিতি’ এবং পরবর্তীতে ‘বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স’এর সাথে যুক্ত হন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবার সাহায্যে তিনি প্রথমবার কোমরে লুকিয়ে কলকাতা থেকে ঢাকায় অস্ত্র পাচার শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে হারমোনিয়ামের ভেতরে অস্ত্র লুকিয়ে যাতায়াত করতেন। বাংলার অত্যাচারী গভর্নর জন অ্যান্ডারসনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গঠিত দলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৩৪ সালের মে মাসে দার্জিলিংয়ের লেবং রেস কোর্সে গভর্নরকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এই অভিযানে ভবানীপ্রসাদ ভট্টাচার্য, রবি ব্যানার্জী ও সুকুমার ঘোষের সাথে উজ্জ্বলা মজুমদারও সরাসরি যুক্ত ছিলেন।অ্যান্ডারসনকে আক্রমণের পর তিনি পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে নানা ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তবে শেষ পর্যন্ত কলকাতা থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে তাঁর ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়।
বাংলা মাকে ইংরেজ সরকারের অধীনতা থেকে মুক্ত করার জন্য বাংলার দামাল ছেলেদের হাতে হাত মিলিয়েছিল বহু বঙ্গকন্যারাও, যাঁদের আমরা জানিনা। জানলেও স্মরণ করিনা। ব্রিটিশ সরকারের ব্যাঘ্ররোশ হার মেনেছিলো এইসব সিংহীদের তেজে। বিপ্লব শুধু বন্দুকের নলে নয়, বিপ্লব ছিল তাঁদের হৃদয়ে, মননে। এইসব অগ্নিকন্যাদের ছাড়া ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস অসম্পূর্ণ।
লেখক: সহ-প্রধানশিক্ষিকা,
লবনহ্রদ বালিকা বিদ্যালয়, সল্টলেক, উত্তর ২৪ পরগনা
