সেই সময়ের যে ইতিহাস জানতে পারি, তা মূলত তিনটি প্রধান উৎস থেকে। সমসাময়িক প্রত্যক্ষদর্শীদের চিঠি ও ডায়েরি, তৎকালীন ছড়া বা লোকগাথা এবং পরবর্তীকালে সংকলিত কিছু প্রামাণিক বিবরণ। তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেশ কিছু কর্মকর্তা ও ইংরেজ পরিব্রাজক সে সময়ের বাংলার যে বিবরণ রেখে গেছেন, তা পড়লে শিউরে উঠতে হয়। লিখেছেন সবিতা দাস।
“গ্রামের পর গ্রাম উৎসন্ন গেল। সুন্দর সুন্দর জনপদ অরণ্যভূমিতে পরিণত হইতে লাগিল। যেখানে সহস্র মনুষ্য কোলাহল করিত, সেখানে সহস্র শৃগাল ক্রন্দন করিতে লাগিল। যেখানে যুবতীগণের অলঙ্কার-ঝঙ্কার শ্রুত হইত, সেখানে পেচক ডাকিতে লাগিল।”
পটভূমি- ইংরেজি ১৭৭০ সাল অর্থাৎ বাংলা ১১৭৬। বাংলা ১১৭৬ এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত । ইংরেজদের অতিরিক্ত করের চাপে যখন জনগণ ও কৃষকের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা, সেই সময় দেশে পরপর তিন বছর অনাবৃষ্টির কারণে খরায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এর ফলে বাংলায় ব্যাপক দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়।মানবসভ্যতার ইতিহাসে খাদ্যাভাব শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফল নয়,বরং সামাজিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীর সংকটেরও প্রতিফলন।
“মন্বন্তর শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘মনু’ (মানবজাতির আদিপুরুষ) এর শাসনকাল বা সময়কাল। হিন্দু সৃষ্টিতত্ত্ব বা পৌরাণিক সময় গণনা অনুযায়ী, এক একটি নির্দিষ্ট সময়কালকে মন্বন্তর বলা হয়। তবে বর্তমানে , ব্যাপক দুর্ভিক্ষ, তীব্র অনটন বা দেশব্যাপী মহামারি অর্থে ব্যবহৃত হয়।ঐতিহাসিকভাবে বাংলায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ভিক্ষগুলো ‘মন্বন্তর’ নামে পরিচিত, যেমন ১৭৭০ সালের ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ (বাংলা ১১৭৬) এবং ১৯৪৩ সালের ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ (বাংলা ১৩৫০)।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস এবং ইতিহাসের ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’—এই দুটি নাম একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে (বাংলা ১১৭৬ বঙ্গাব্দ) নেমে আসা সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষকে পটভূমি করেই বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর এই যুগান্তকারী রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘আনন্দ মঠ’ রচনা করেছিলেন।
পটভূমি হিসেবে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর
‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের সূচনাই হয় ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের এক নির্মম ও জীবন্ত বর্ণনার মধ্য দিয়ে। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডে বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন কীভাবে একসময়ের সমৃদ্ধ পদচিহ্ন গ্রাম অনাহার, মহামারী আর মড়কের গ্রাসে শ্মশানে পরিণত হয়েছিল।
মানুষ কীভাবে সন্তান ও পরিবার পরিজন ত্যাগ করছে, চাল-শস্যের অভাবে গাছের পাতা ও ঘাস খাচ্ছে—তার এক মর্মস্পর্শী চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে। উপন্যাসের মূল চরিত্র মহেন্দ্র এবং তাঁর স্ত্রী কল্যাণীও এই দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে ঘর ছাড়তে বাধ্য হন।
মন্বন্তরের পেছনে রাজনৈতিক কারণ এবং ‘সন্তান দল’
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা বা অনাবৃষ্টির কারণে ঘটেনি। এর পেছনে ছিল তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সীমাহীন শোষণ, করের নির্মম জাঁতাকল এবং দ্বৈত শাসনব্যবস্থা।
”জ্ঞান থাকিতে অজ্ঞান কেন? তুমি ধন দিতে আসিয়াছ, আমরা ধন লই না; আমরা কেবল সন্তান— সকল ধনের অধিকারী। মায়ের উদ্ধার না করিয়া আমরা ছাড়িব না।”
সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে দেখিয়েছেন যে, যখন সাধারণ মানুষ না খেতে পেয়ে মরছে, তখনও কোম্পানির কর্মচারীরা জোরপূর্বক খাজনা আদায় করে চলেছে। এই চরম অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে বঙ্কিমচন্দ্র রূপ দিয়েছেন ‘সন্তান সেনা’ বা ‘সন্তান দল’-এর বিদ্রোহে। সত্যানন্দ, ভবানন্দ, জীবানন্দের মতো চরিত্ররা দেশমাতৃকাকে পরাধীনতা ও অনাহারের হাত থেকে মুক্ত করতে এক সশস্ত্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ইতিহাস বনাম সাহিত্য (সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ)
ইতিহাসের পাতায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সমসাময়িক কালে বাংলায় যে ‘সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ’ঘটেছিল, ‘আনন্দমঠ’-এর সন্তান বিদ্রোহ মূলত তারই একটি সাহিত্যিক ও জাতীয়তাবাদী রূপান্তর।ঐতিহাসিক সন্ন্যাসী বিদ্রোহে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষই অংশ নিয়েছিলেন।
তবে মনে রাখতে হবে, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর উপন্যাসে একে একটা সুসংগঠিত, আধ্যাত্মিক এবং আদর্শবাদী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপ দেন, যা পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের (বিশেষ করে সশস্ত্র বিপ্লবীদের) গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্রের জন্ম
এই মন্বন্তর ও শোষণের পটভূমিতে দাঁড়িয়েই বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর উপন্যাসে ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি অন্তর্ভুক্ত করেন। মহাজাগতিক দুঃখ ও দুর্ভিক্ষের অন্ধকারে ডুবে যাওয়া দেশ মাতাকে বঙ্কিমচন্দ্র প্রথমে ধন-ধান্য-পুষ্পভরা ‘সুজলাং সুফলাং’ রূপে কল্পনা করেছেন, এবং পরে শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দশপ্রহরণধারিণী দুর্গারূপে দেখিয়েছেন।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর যদি হয় বাংলার ইতিহাসের এক চরমতম কালো অধ্যায় ও যন্ত্রণার দলিল, তবে ‘আনন্দমঠ’ হলো সেই যন্ত্রণা থেকে জন্ম নেওয়া এক তীব্র প্রতিবাদ ও জাতীয়তাবাদের মন্ত্র। বঙ্কিমচন্দ্র শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক দুর্ভিক্ষকে ফুটিয়ে তোলেননি, বরং দেখিয়েছেন কীভাবে চরম বিপর্যয় ও শোষণের বুক চিরেও দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের অগ্নিশিখা জ্বলে উঠতে পারে।
“ধান হলো না চাল হলো না, কেবল তুষ ছড়ানো!”
আনন্দমঠ ছাড়াও, ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সমসাময়িক সময়ে পল্লী কবি ও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে অনেক ছড়া ও গান তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে সংকলিত হয়।
এই সাহিত্যকর্মগুলো শুধুমাত্র দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতার বিবরণ নয়, বরং মানুষের চরম সংকটের সময়ে সমাজ, রাজনীতি ও মানবিক মূল্যবোধের যে পরীক্ষা হয়—তার এক একটি ঐতিহাসিক দলিল।ছিয়াত্তরের মন্বন্তর যখন বাংলাকে গ্রাস করেছিল, তখন তা কেবল একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল না—তা ছিল কোম্পানি আমলের চরম কুশাসন, অতিরিক্ত খাজনা আদায় এবং তীব্র খরা ও গুটিবসন্তের এক মরণফাঁদ।
সাধারণ মানুষের হাহাকার ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল মুখে মুখে তৈরি হওয়া ছড়া, পাঁচালি ও গানের মাধ্যমে। নিরক্ষর গ্রামীণ মানুষ তাদের চোখের সামনের নির্মমতাকে এভাবেই ধরে রেখেছিল।
অনাবৃষ্টির কারণে ফসল শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেও রেজা খাঁ এবং কোম্পানির গোমস্তারা জোর করে খাজনা আদায় করছিল:
“১১৭৬ সালে হলো মন্বন্তর,
মায়ে পোয়ে ছাড়াছাড়ি হলো কতান্তর।
চাল নাই, ধান নাই, কাঁদে প্রজাগণ,
তার ওপর কোম্পানি লয় খাজনার ধন।”
ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ ঘাস, গাছের পাতা খেতে শুরু করেছিল। সন্তানকে হাটে বিক্রি করে দেওয়ার মতো ঘটনাও সমসাময়িক ছড়ায় উঠে আসে:
“টাকার চাল চার সের হলো,
সোনা-দানা বেচে মানুষ কচু-ঘেঁচু খেলো।
পেটের দায়ে মায়ে তার পুতেরে বেচিল,
ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলা উজাড় হইলো।”
মহীচাঁদ ও সমকালীন কবিদের পাঁচালি:
সে সময়ের কিছু কবি তাঁদের পুঁথিতে লিখেছেন যে, মুর্শিদাবাদ ও কলকাতার মতো বড় শহরগুলোতে যখন গ্রামের ভুখা মানুষ ভিড় করতে শুরু করে, তখন কোম্পানি বা নবাবের পক্ষ থেকে যে সামান্য লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল, তা ছিল সমুদ্রের মধ্যে এক ফোঁটা জলের মতো। লঙ্গরখানার পচা খিচুড়ি খাওয়ার জন্য মানুষের কাড়াকাড়ি এবং সেই লাইনেই অনেকের মৃত্যুর বিবরণ সমকালীন পুঁথিগুলোতে পাওয়া যায়।
খৈরাত ছড়া ও ঐতিহাসিক লোকগাথা:
খৈরাত ছড়া (বা খয়রাতি ছড়া) ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সমকালীন লোকসাহিত্যের এক অমূল্য ও অত্যন্ত বেদনাদায়ক দলিল। মন্বন্তরের তীব্র ক্ষুধার জ্বালায় যখন বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন, তখন পল্লী কবিদের মুখে মুখে এই ছড়াগুলি রচিত ও প্রচারিত হয়েছিল।
‘খৈরাত’ বা ‘খয়রাত’ শব্দের অর্থ দান বা ভিক্ষা। দুর্ভিক্ষের সময় কোম্পানি বা স্থানীয় জমিদারদের পক্ষ থেকে যে নামমাত্র অন্ন বা সাহায্য দেওয়া হতো, তাকে কেন্দ্র করে এবং ক্ষুধার্ত মানুষের ভিক্ষা পাওয়ার আকুলতা থেকে এই ছড়াগুলোর নামকরণ হয়েছে। উচ্চমার্গের সাহিত্যে যখন এই দুর্ভিক্ষের বিবরণ তেমনভাবে স্থান পায়নি, তখন গ্রামীণ চারণকবি ও সাধারণ মানুষ এই ছড়ার মাধ্যমে ইতিহাসের সবচেয়ে খাঁটি চিত্রটি ধরে রেখেছিলেন। চাল-ডালের আকাশছোঁয়া দাম এবং খাদ্যের অভাব কীভাবে মানুষকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিল, তা এতে স্পষ্ট:
“বাঁশ বনেতে মরল মানুষ, শিয়াল কুকুরে খায়,
চালের চালানী এসে সোনার বাংলা খায়।
টাকাতে চার সের চাল, তাও তো পাওয়া ভার,
খৈরাত করতে এল বাবু, জুটল হাহাকার।”
ক্ষুধার তাড়না মানুষকে এতটাই নির্মম করে তুলেছিল যে, বেঁচে থাকার জন্য মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস—এমনকি নিজের সন্তানকেও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। খৈরাত ছড়াগুলোতে এই সামাজিক ও পারিবারিক ভাঙনের ছবি অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে ফুটে উঠেছে:
“ঘটি বাটি বেচলাম রে ভাই, বেচলাম হাতের বালা,
পেটের দায়ে শেষে বেচলাম কোলের ছাওয়াল পালা।
এক পোয়া চালের তরে কাঁদে ঘরের নারী,
খৈরাতের চাল নিতে যেয়ে ভেঙে গেল হাঁড়ি।”
এই লোকসাহিত্যের দর্পণে ঔপনিবেশিক শোষণ ও দ্বৈত শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দুইই স্পষ্ট প্রতিভাত। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ এবং রেজা খাঁর মতো নায়েব-নাজিমদের নির্মম রাজস্ব আদায়ের ফলে মন্বন্তর মহামারী রূপ নিলে খৈরাত ছড়াগুলোতে এই রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে গ্রামীণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ ও উপহাস প্রকাশ পেয়েছিল। লর্ড ক্লাইভ বা কোম্পানির কর্মচারীদের কর আদায়ের নিষ্ঠুরতাকে সাধারণ মানুষ ঈশ্বরের অভিশাপের পাশাপাশি মানুষের তৈরি বিপর্যয় হিসেবেও চিহ্নিত করেছিল। বাংলা সাহিত্যে খৈরাত ছড়া ইতিহাসের বিকল্প উৎস হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারি নথিপত্রে যেখানে কেবল সংখ্যার হিসাব আর রাজস্বের খতিয়ান পাওয়া যায়, সেখানে খৈরাত ছড়া আমাদের দেয় সাধারণ মানুষের কান্না, হাহাকার আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মানবিক ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যে ট্র্যাজেডির যে ধারা, তার একটি আদিম ও লৌকিক রূপ এই ছড়াগুলো। এখানে কোনো কাল্পনিক নায়ক নেই, খোদ ‘ক্ষুধা’ এবং ‘মৃত্যু’ই এখানে মূল চরিত্র।
পরবর্তীকালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস রচনা করেন, তখন গ্রামীণ জনপদের এই লোকগাথা এবং ছড়াগুলিই তাঁকে মন্বন্তরের বাস্তব আবহ তৈরি করতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছে।
প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্রের লেখায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (বাংলা ১১৭৬ সন,) পটভূমি হিসেবে উঠে এসেছে। তাঁর একটি সুপরিচিত ছোটগল্পের নাম ‘প্রতিবাদ’। এই গল্পটি মূলত ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সেই ভয়াল ও কঠিন সময়ের এক মর্মস্পর্শী পারিবারিক পরিস্থিতি এবং এক চরম প্রতিবাদের কাহিনীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সরাসরি এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে এসেছে। তাঁর বিখ্যাত ‘ধাত্রীদেবতা’ উপন্যাসে এই ঐতিহাসিক ও বেদনাদায়ক অধ্যায়টির উল্লেখ ও প্রভাব দেখতে পাই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট এবং চরিত্রায়নে:
ঐতিহাসিক যোগসূত্র: ‘ধাত্রীদেবতা’ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র ‘পিসিমা’। পিসিমার মুখ দিয়ে লেখক তাঁর পূর্বপুরুষদের ইতিহাস এবং ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সেই ভয়াবহ দিনগুলির বিবরণ তুলে ধরেছেন।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিবর্তন: মন্বন্তরের ফলে কীভাবে বাংলার গ্রামীণ সমাজ, জমিদারি ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের চেনা অর্থনীতি ও নৈতিকতা ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল, তারাশঙ্কর তাঁর স্বভাবসুলভ বাস্তববাদী ও সংবেদনশীল লেখনীর মাধ্যমে তা উপন্যাসের পটভূমিতে বুনে দিয়েছেন।
গভর্নর জেনারেল জন শোর ১৭৭০ সালে একজন তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে বাংলায় ছিলেন। তিনি এই দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা দেখে একটি দীর্ঘ কবিতা এবং বেশ কিছু চিঠি লিখেছিলেন। তিনি লিখেছেন: “এমন দৃশ্য মানুষ কখনো দেখেনি, যেখানে জীবিতরা মৃতদের সৎকার করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। রাস্তাঘাট, মাঠ-প্রান্তর কেবলই লাশে ঢেকে গিয়েছিল। কুকুর, শিয়াল এবং শকুনরা সেইসব মৃতদেহ নিয়ে টানাটানি করত, আর জীবিত মানুষেরা ক্ষুধার জ্বালায় অবর্ণনীয় সব কাণ্ড করছিল। “
উইলিয়াম হান্টার,তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Annals of Rural Bengal'(যদিও এটি পরে লেখা, কিন্তু সমসাময়িক সমস্ত সরকারি নথি ও চিঠিপত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি)-এ তিনি লিখেছেন: “১৭৭০ সালের গ্রীষ্মকালে দুর্ভিক্ষ তার চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। মাঠের পর মাঠ জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। লাশের গন্ধে বাংলার বাতাস এত বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল যে, বড় বড় শহরগুলোর রাস্তা দিয়ে হাঁটা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। প্রায় ৩৫% মানুষ অনাহারে মারা যায় এবং বাংলার এক-তৃতীয়াংশ জমি সম্পূর্ণ জঙ্গল হয়ে যায়। “
একটি নির্মম ঐতিহাসিক সত্য:
এই সমসাময়িক বিবরণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং ভয়ের বিষয় হলো—১৭৬৯ ও ১৭৭০ সালে যখন বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ (প্রায় ১ কোটি) না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে, ঠিক সেই বছরগুলোতেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় তাদের খাজনা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় সম্পূর্ণ পূরণ করেছিল। সমসাময়িক সরকারি রেকর্ড দেখায়, ১৭৭১ সালেও কোম্পানি আগের বছরের চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করেছিল, যা এই মন্বন্তরকে ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর মানবসৃষ্ট বিপর্যয় হিসেবে প্রমাণ করে।
লেখক: শিক্ষিকা,
বালিয়া নফরচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়, গড়িয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনা।
