|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
পরাধীন দেশে পলিটিক্যাল পার্টিগুলি তৈরী না হলে আর তাতে দেশের তীব্র মেধাবীরা সুখের জীবন ছেড়ে রাজনীতিতে না নামলে ভারতবর্ষ ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট সর্ববৃহৎ গনতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতো না। কংগ্রেসের মতো প্রকাশ্য রাজনৈতিক গণআন্দোলন, অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর বা আজাদ হিন্দ ফৌজের মতো গোপন ও সশস্ত্র বিপ্লব—উভয় ধারাই একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছিল, লিখেছেন সৌম্যব্রত দে।
১. ‘বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি’
পরাধীন ভারতে প্রথম রাজনৈতিক সংগঠনটি গড়ে উঠেছিল এই কোলকাতাতেই। ১৮৪৩ সালের ২০ এপ্রিল জর্জ মিশন ও তারকনাথ ঠাকুর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হলেও এই সংগঠনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল এক দল তরুণ তুর্কি। তারা হিন্দু স্কুলের শিক্ষক ডিরোজিওর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছাত্রসমাজ। ইয়ং বেঙ্গল। বেঙ্গল স্পেক্টেটর নামে একটি পত্রিকার মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে জাতীয় চেতনাকে লালন করা ও মানুষের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে ভারতবাসী জানানো ছিল এই সংগঠনের উদ্দেশ্য।
২. ‘ভারতের জাতীয় কংগ্রেস’:
প্রথম পথ চলা অ্যালান অক্টভিয়ান হিউম, উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও দিনেশ ওয়াচারের হাত ধরে ১৮৮৫ সালে বোম্বেতে (মুম্বাই)। পরবর্তীতে যে সকল নাম এই দলটির সঙ্গে জড়িয়েছিল তারা নিজেরাই এক একজন প্রতিষ্ঠান। মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু, বল্লভভাই প্যাটেল। এমনকি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীও এই দলেরই। প্রথম দিকে এই দলের নরমপন্থী নেতৃত্ব আবেদন-নিবেদনের নীতি মেনে চললেও, পরবর্তীতে এটি একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, লবণ সত্যাগ্রহ এবং ১৯৪২ সালে গান্ধীজির নেতৃত্ব ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন এই দলের উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি। ব্রিটিশ সরকারকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করার পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা পালন করেছিল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস।
৩. অনুশীলন সমিতি:
১৯০২ সালে প্রমথনাথ মিত্রের নেতৃত্বে বাংলায় গঠিত হয় এক গোপন সংগঠন, অনুশীলন সমিতি। আপাতদৃষ্টিতে শরীরচর্চার অনুশীলন হলেও ছেলেদের শেখানো হতো লাঠিখেলা, তালোয়ার-পিস্তল চালানো, এমনকি বোমা তৈরীর প্রশিক্ষন পর্যন্ত। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী,সতীশচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, মানিকতলা বোমা মামলা, আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা এই শব্দগুলো সে যুগে ব্রিটিশদের মনে ‘ একটি বিশুদ্ধ ভয়’ ঢোকাতে পেরেছিলো। একটা সময় ভগিনী নিবেদিতাও যুক্ত ছিলেন এই সংগঠনের সঙ্গে।ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের হত্যা এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে তাঁরা বিভিন্ন সফল রাজনৈতিক ডাকাতি করতেও পিছপা হননি।
৪. যুগান্তর:
অভ্যন্তরীণ মতভেদের জেরে ১৯০৬ সালে অনুশীলন সমিতি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ও যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ( বাঘা যতীন)।এঁদের হাতধরে আত্মপ্রকাশ ঘটে যুগান্তর দলের। এই দলের মুখপত্র ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় এপ্রিলের সম্পাদকীয়তে লেখা হলো,”দেশের ৩০ কোটি মানুষ যদি তাদের ৬০ কোটি হাত প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞায় তুলে ধরে তবেই বন্ধ হবে এ অত্যাচার। একমাত্র শক্তি দিয়েই শক্তির প্রকাশকে স্তব্ধ করা সম্ভব।” ১৯১৫ সালে বাঘা যতীনের বুড়িবালামের যুদ্ধ, জার্মানি থেকে অস্ত্র এনে ভারতের মাটিতে বড়সড় অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা (হিন্দ-জার্মান ষড়যন্ত্র) যুগান্তর দলের প্রধান কর্মকান্ড গুলির মধ্যে অন্যতম।
৪. গদর:
সময়টা ১৯১২ সাল। বড়লাটের লর্ড হার্ডিঞ্জ এর ওপর ছোঁড়া বোমা মামলায় হন্যে হয়ে এক বাঙালি বিপ্লবীকে খুঁজে চলেছে ব্রিটিশ পুলিশ। সে সময় বাংলা ও পাঞ্জাবের বিপ্লবীদের সঙ্গে সেতু বন্ধনের কাজটি করতেন তিনি। রাসবিহারী বসু। এই সময় ১৯১৩ সালে আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোতে জন্ম হয় এক রাজনৈতিক দলের। দলের মুখপত্র ‘গদরে’র প্রথম সংখ্যাতেই লেখা হয়,”তোমার নাম কি? বিদ্রোহ! তোমার কাজ কি? – বিদ্রোহ!
কোথায় তা করবে? – ভারতবর্ষে। কী দিয়ে লিখবে বিদ্রোহের বাণী? – কালি নয়, রক্ত দিয়ে।”
১৯১৫ সালে ভারতের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে একযোগে বিদ্রোহ ঘটানোর বিশাল পরিকল্পনা করেছিল তাঁরা। রাসবিহারী বসু এই পরিকল্পনার ভারতের মূল দায়িত্বে ছিলেন। যদিও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তা ব্যর্থ হয়, তবুও এটি ব্রিটিশ রাজের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
৬. হিন্দু মহাসভা:
মূলত তৎকালীন মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং ব্রিটিশ সরকারের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতির বিরুদ্ধে হিন্দু স্বার্থ রক্ষার নিমিত্তে ১৯১৫ সালে পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য, লালা লাজপত রায় এবং মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর মতো বিশিষ্ট নেতাদের উদ্যোগে গঠিত হয় হিন্দু মহাসভা। পরবর্তীতে দামোদর সাভারকরের হাত ধরে ‘হিন্দু মহাসভা’ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক রূপ পায়। হিন্দু মহাসভার মূল লক্ষ্য ছিল ভারতকে একটি অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা। ব্রিটিশদের দ্বারা প্রস্তাবিত ভারতের যেকোনো ধরনের বিভাজনের তীব্র বিরোধী ছিল এই সংগঠন। ১৯৪০-এর দশকে বাংলায় ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হাতধরে সংগঠনের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়। ১৯৪৬-৪৭ সালে যখন দেশভাগ অনিবার্য হয়ে পড়ে, তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘হিন্দু মহাসভা’ আন্দোলন গড়ে তোলে, যার ফলে সম্পূর্ণ বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে হিন্দুপ্রধান অংশটি ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামে ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ভারতীয় রাজনীতিতে ডানপন্থী ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিকাশে এই সংগঠনের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
৭. আজাদ-হিন্দ-ফৌজ:
সেসময়ের ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (বর্তমান ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস) পরীক্ষায় চতুর্থ হয়েও সুখের জীবন ত্যাগ করে রাজনীতিতে নামলেন সুভাষচন্দ্র বোস। বিশ্বজুড়ে বাজছে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। সুভাষ বুঝলেন ইংরেজদের হাত থেকে ভারতকে মুক্ত করার এই প্রকৃত সময়। ডাক দিলেন এক সশস্ত্র বিপ্লবের। তৈরী হলো আরো একটি দল। ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)। ১৯৪২ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাসবিহারী বসু এবং ক্যাপ্টেন মোহন সিং-এর হাত ধরে এর সূচনা হলেও, ১৯৪৩ সালে সুভাষ এর দায়িত্ব নিয়ে একে এক অপরাজেয় সেনাবাহিনীতে রূপ দেন। ‘দিল্লি চলো’, ‘ঝাঁসির রানি বাহিনী’,’ইম্ফল ও কোহিমা দখল’ করলো। ‘ভারতের মাটিতে প্রথম স্বাধীন পতাকা উত্তোলন’ প্রভৃতি শব্দবন্ধ করে ভারতের অভ্যন্তরে ব্রিটিশ অনুগত নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল আমাদের নেতাজি।
লেখক: সহ-শিক্ষক,
কুমার আশুতোষ ইনস্টিটিউশন, দমদম, উত্তর ২৪ পরগনা।
