Getting your Trinity Audio player ready...

লোকমানস সাধারণ শ্রুতি ও স্মৃতি-নির্ভর লোকসঙ্গীত রাজ্যের অন্যতম ধারা, এটি মূলত মুখে মুখে প্রচলিত ও পরম্পরায় বেঁচে থাকা গানকে বোঝায়। মূলত বাংলার লোকজীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনসংগ্রাম এর মূল বিষয়কে কেন্দ্র করে যেসমস্ত লোকগান, এরকম জনপ্রিয় সাতটি লোকসঙ্গীত নিয়ে লিখেছেন মৌমিতা দাস মন্ডল।

প্রাতিষ্ঠানিক বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নয়, বরং সাধারণ গ্রাম্য জীবনের প্রতিশ্রুত-শিল্প কথা এবং সুরই লোকসঙ্গীতের মূল আকর্ষণ। গীত, বাদ্য ও নৃত্য এই তিনের সমন্বিত রূপ হচ্ছে লোকনৃত্য। লোকসঙ্গীতের কোনো লিখিত রূপ তৈরি হয় না। এটি মূলত মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
সম্পূর্ণ আঞ্চলিক ভাষায় ও শব্দচয়ন নির্ভর লোকসঙ্গীতের প্রতিদিনের জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না ও জীবন সংগ্রাম হলো এই গানের মূল বৈশিষ্ট। লোকসঙ্গীত সাধারণত কোন একক ও পরিচিত ব্যক্তির সৃষ্টি নয়। বহু ক্ষেত্রে রচয়িতার নাম জানা যায় না। তবে, লোকমুখে গানে কিছু হেরফের ও পরিবর্তন হয়ে থাকে। একতারা, দোতারা, খঞ্জনি, মাদল, ঢোল, করতাল ইত্যাদি আঞ্চলিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে যে লোকসঙ্গীতের সুর বহুশ্রুত, এমন সাতটি ধারা হলো –

১. বাউল গান:
বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত হল বাউল গান। এর মূল বিষয়বস্তু প্রকৃতি। এছাড়াও আধ্যাত্মিকতা, প্রেম, দর্শন ও দেহতত্ত্ব ইত্যাদির সংমিশ্রণে সৃষ্ট বাউল গানকে লোকসঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র বলা হয়। লালনের গানগুলিকে লালনগীতি বলা হয়। বাউলরা মুখে মুখে গান বাঁধেন। এর কোন লিখিত রূপ হয় না। একতারা বাজিয়ে এই গান গাওয়া হয়। তবে দোতারা, ডুগডুগি, ঢোল, করতাল, মঞ্জিরা ও নূপুরের ব্যবহারও এই গানে হয়ে থাকে। রবীন্দ্র সঙ্গীতেও বাউল গানের প্রভাব যথেষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম ও নদীয়ায় বাউল গানের বিস্তার বেশি হলেও সব জেলাতেই বাউলদের কমবেশি আনাগোনা রয়েছে।

২. গম্ভীরা:
মালদা জেলার অন্যতম জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত হল গম্ভীরা। গানের পাশাপাশি এতে নাচের পরিবেশনও হয়। মূলত চৈত্র মাসের চড়ক উৎসবের সময় শিবের মহিমা কীর্তন নাচ ও গানের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। দুজন শিল্পী গম্ভীরা পরিবেশন করেন। কখনও মুখোশ পড়ে বিভিন্ন দেবদেবীর সাজে অথবা কখন দুটি কাল্পনিক চরিত্র তৈরি করে সামাজিক সমস্যা বর্ণনা করে নাচ ও গান পরিবেশন করা হয়। গম্ভীরাতে ঢোলের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. ভাটিয়ালি:
ভাটিয়ালি হল মূলত মাঝিদের গান। নদীতে নৌকা বাইতে বাইতে মিষ্টি সুরে মাঝিরা এই গান গেয়ে থাকেন। ‘ভাটিয়ালি’ শব্দটি এসেছে ভাটা শব্দ থেকে। বিমূর্ত সুরের এই গানের বিষয়বস্তু সাধারণত মাছ ধরা ও নদী। মূলত এই গান নিঃসঙ্গতা ও নদীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। ঐতিহ্যগতভাবে এই গান গাওয়ার সময়ে কোন জটিল বাজনা ব্যবহার হয় না। শুধুমাত্র একতারা, দোতারা ও খঞ্জনি সহযোগে মাঝিরা সুর ধরেন। ভাটিয়ালি সুরকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে গানের মধ্যে শচীন দেববর্মন ব্যবহার করে জনপ্রিয় করেছেন ।

৪. ভাওয়াইয়া:
কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও উত্তর দিনাজপুরের জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত হল ভাওয়াইয়া। এটি মূলত রাজবংশী ও মাহুত-গাড়িয়ালদের গান। রাখালরা মাঠে গরু চড়ানোর সময় কিংবা মাহুতরা হাতি চালনার সময় এই গান গেয়ে থাকেন। মূলত রাজবংশী আঞ্চলিক ভাষায় গাওয়া গানে মিশে থাকে মিঠেকড়া সুরের অনুভূতি। আবার অনেকে বলেন, বেশির ভাগ ভাওয়াইয়া গান তৈরি হয় নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে। নারী মনের একাকীত্ব, তীব্র আকাঙ্খা ও বিরহের চিত্র ফুটে ওঠে গানের কলিতে। ভাওয়াইয়া গানে প্রধান বাজনা হলো দোতারা। এছাড়াও বাঁশি ও মন্দিরা ব্যবহার হয়।

৫. কবিগান:
মুখে মুখে ছড়া কেটে সুর দিয়ে বিশেষ ভঙ্গীতে গাওয়া গানের নাম ‘কবিগান’। পশ্চিমবঙ্গীয় কবিগান কলকাতার বাবুদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিস্তার লাভ করে। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গীয় কবিগান মূলত গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি। লোকাচার, সামাজিকতা ও শিক্ষামূলক বিষয়কে ভিত্তি করে ধাঁধা বা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আগেতে কবিগান বাঁধা হত। এপার বাংলায় কবিগান আজ প্রায় বিলুপ্ত। কবিগান শুরু হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্দনার মাধ্যমে। সাধারণত দুজন প্রতিদ্বন্দী দলের মধ্যে তর্কের মাধ্যমে কবির লড়াই জমে ওঠে। কবিগান শিখতে হলে শাস্ত্রপাঠ ও কাব্যপ্রতিভার পাশাপাশি শিখতে হয় মঞ্চ উপস্থাপনার কৌশলও। ভোলা ময়রা, অ্যান্টনি কবিয়াল কবিগানের দিকপাল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এনারা আসরেই কথায় কথায় গান বাঁধতেন। প্রধান শিল্পীদের সাথে যাঁরা গানে সঙ্গ দিতেন তাঁদের বলা হত দোহার।

৬. সারি গান:
মাঝি-মাল্লা ও জল সওয়ারদের নিজস্ব সৃষ্টি সারিগান। নৌকা প্রতিযোগিতার সময়ে সাধারণত এই গান গাওয়া হয়। আবার একনাগাড়ে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে, নিজেদের মনোরঞ্জনের জন্য তাঁরা মুখে মুখে গান বাঁধেন। এই গানের কথা ও সুর মরমী ধাঁচের বলা হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব এই ধারায় নৌকা চালনার শ্রম-সঙ্গীত ও কর্ম-সঙ্গীত হিসেবে এই গান পরিচিত। মোগল বাদশাহদের নৌবাহিনীর প্রচলনের সময় সারিগানের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এছাড়া নির্মাণ-শ্রমিকরা ছাদ পেটানোর সময়েও সারি গান পরিবেশন করেন ।

৬. পল্লীগীতি:
গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, প্রেম ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আরেকটা গান হলো ‘পল্লীগীতি’। এটি আবহমান কাল ধরে মানুষের মুখে মুখে চলে আসছে। এর মধ্যে বাউল, গম্ভীরা, ভাটিয়ালী উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণ কথ্য উপভাষা, সহজ-সরল শব্দচয়ন পল্লীগীতির বৈশিষ্ট্য। লিখিত রূপের চেয়ে মানুষের মুখে মুখে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

৭. ঝুমুর:
ভারতের রাঢ় অঞ্চল, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম ও বীরভূমের অন্যতম জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত। রাধাকৃষ্ণলীলা, স্থানীয় পৌরাণিক কাহিনী প্রভৃতি ভূমিজ স্থানীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সুরপ্রধান সঙ্গীতধারা। প্রধানত ঝুমুর ঋতুভিত্তিক উৎসবের গান হিসেবে গাওয়া হয়। ঢোল, মাদল, বাঁশি ও হারমোনিয়াম ঝুমুরের প্রধান বাদ্যযন্ত্র।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুখে মুখে প্রচলিত এই গানগুলো আমাদের শিকড়ের সন্ধান দেয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বাঁচিয়ে রেখেছে। লোকসঙ্গীত গ্রামীণ সমাজের প্রতিচ্ছবি, যা লোকসাহিত্য, রীতিনীতি ও জীবনযাত্রার খণ্ডচিত্র তুলে ধরে। নতুন বাদ্যযন্ত্রের অনুষঙ্গ এবং ফিউশনের মাধ্যমে লোকসঙ্গীত আজ বিশ্বের দরবারে ভীষণভাবে সমাদৃত হচ্ছে।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষিকা,
বেহালা জয়শ্রী শিক্ষানিকেতন, কলকাতা

তথ্যসূত্র:
* সাইমন জাকারিয়া, বাংলাদেশের লোকনাটক, ঢাকা বাংলা একাডেমী ২০০৪
* ন্যাশনাল ডিজিটাল লাইব্রেরি অব ইন্ডিয়ার গবেষণাপত্র
* উইকিপিডিয়া
* ওয়েস্ট বেঙ্গল ফোক সংসদ
* ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশ লাইব্রেরি